৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ; বাড়ছে বাজেট ঘাটতি ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন মাইলফলক
- আপডেট সময় : ০৫:০৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ঋণের এই নতুন মাইলফলক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয় এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ‘Debt to the Penny’ ডেটাসেটে দেশটির মোট ফেডারেল ঋণের দৈনিক হিসাব প্রকাশ করা হয়। সাম্প্রতিক তথ্য ও ২০ আগস্টের প্রতিবেদনে ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রমের বিষয়টি উঠে এসেছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ছিল প্রায় ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় এক দশকের মধ্যে দেশটির ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
ঋণ বৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ও পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকালীন সরকারি ব্যয় থেকে। ২০২০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রণোদনা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য কর্মসূচিতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। দুই মেয়াদ মিলিয়ে ট্রাম্পের সময় ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, জো বাইডেনের চার বছরের প্রেসিডেন্ট মেয়াদে ঋণ বেড়েছিল প্রায় ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার, অবকাঠামো বিনিয়োগ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে ব্যয় এবং অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি বিদ্যমান বাজেট ঘাটতিও এ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে জাতীয় ঋণ বৃদ্ধিকে কোনো একক প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি দীর্ঘদিনের এবং এতে কংগ্রেসের অনুমোদিত ব্যয়, কর ও রাজস্বনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ঋণের সুদ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট পরিস্থিতির চাপ বোঝা যায় কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (CBO) হিসাবেও। CBO-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে। একই সময়ে মোট ফেডারেল ব্যয় প্রায় ৭.৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং রাজস্ব প্রায় ৫.৬ ট্রিলিয়ন ডলার হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
২০২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ফেডারেল বাজেট ঘাটতি প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে CBO জানিয়েছে।
জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি প্রায় ৪৩২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে—যা দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় মাসিক ঘাটতি। এই ধরনের বড় ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়, ফলে জাতীয় ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের দ্রুত বৃদ্ধি। CBO-এর ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফেডারেল সরকারের নেট সুদ ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। ২০২৫ সালে এই ব্যয় ছিল প্রায় ৯৭০ বিলিয়ন ডলার।
CBO-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮৯৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পূর্বাভাস রয়েছে। বিপরীতে, সরকারি ঋণের নিট সুদ ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠতে পারে। ফলে সুদ ব্যয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়ে বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ সুদ পরিশোধের অর্থ সরাসরি ঋণদাতাদের দিতে হয় এবং এই ব্যয় কমানোর সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ঋণের পরিমাণ ও সুদের হার বাড়লে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার, মেডিকেইড এবং ভেটেরানদের সুবিধাসহ বাধ্যতামূলক কর্মসূচিগুলো বড় অংশজুড়ে রয়েছে। CBO-এর হিসাবে, ২০২৬ সালে বাধ্যতামূলক ব্যয় প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা মোট ফেডারেল ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ।
একই সঙ্গে সুদ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। CBO বলছে, ২০২৬ সালে নিট সুদ ব্যয় জিডিপির প্রায় ৩.৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৩৬ সালে তা ৪.৬ শতাংশে উঠতে পারে।
ক্রমাগত বড় বাজেট ঘাটতি ও ঋণ বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে। CBO-এর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে দেখা যায়, জনসাধারণের হাতে থাকা ফেডারেল ঋণ ২০২৬ সালে জিডিপির প্রায় ১০১ শতাংশ থেকে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
CBO সতর্ক করেছে, ঋণের সুদ ব্যয় বাড়তে থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি হতে পারে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে এবং সুদের হার বেড়ে গেলে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় আরও দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে একটি সম্ভাব্য আর্থিক সংকটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ কেবল একটি প্রতীকী মাইলফলক নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব-ব্যয় কাঠামো, ঋণের সুদ এবং ভবিষ্যৎ বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপেরও ইঙ্গিত।























