হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, তানজিদ হাসানের ঐতিহাসিক শতক ও মিরাজের পাঁচ উইকেটে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারাল বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতেই হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৪:৩০:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ডারউইনের Marrara Stadium-এ সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে টাইগাররা। এই জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
চতুর্থ দিনেই ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে ২২৮ রানের বড় লিড নেয়। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে অলআউট করে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্য বাংলাদেশ ১৪.২ ওভারে মাত্র এক উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে যায়।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে শুরু থেকেই চাপে রাখে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ। পেসার হাসান মাহমুদ ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করতে বড় ভূমিকা রাখেন। প্রথম ইনিংসে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল ৬/৫৫। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্টিভ স্মিথ ৭১ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাট হাতে অসাধারণ দৃঢ়তা দেখায়। ওপেনার তানজিদ হাসান ১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। তাঁর শতকটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। তাঁর ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে এবং দলের অন্য ব্যাটারদের কার্যকর অবদানে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশের এই ইনিংস অস্ট্রেলিয়ার ওপর ২২৮ রানের বিশাল চাপ তৈরি করে। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই চলে আসে সফরকারীদের হাতে।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ক্যামেরন গ্রিন ১০৪ রানের লড়াকু সেঞ্চুরি করে স্বাগতিকদের ইনিংসকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ দেয়নি।
অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৬৬ বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। তাঁর এই পাঁচ উইকেটের সঙ্গে হাসান মাহমুদের কার্যকর বোলিং বাংলাদেশকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ শুরুতেই একটি উইকেট হারায়। তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেয়নি সফরকারীরা। ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ তুলে নিয়ে ৯ উইকেটের বিশাল জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় জয় নিশ্চিত হয়।
ম্যাচে মোট ৯ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম প্রধান নায়ক হন হাসান মাহমুদ। মেহেদী হাসান মিরাজও ব্যাট ও বল—দুই বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৬৫ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।
এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জেতা এশিয়ার তৃতীয় দল হিসেবে ভারতের ও পাকিস্তানের সঙ্গে নাম লেখাল।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ বিরতির পর টেস্ট খেলতে নেমেই এমন সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটি ১৩ আগস্ট শুরু হয় এবং ১৭ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল; কিন্তু বাংলাদেশ চতুর্থ দিনেই জয় নিশ্চিত করে। দুই দলের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকের Great Barrier Reef Arena-তে।
ডারউইনের এই ঐতিহাসিক জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। আগামী ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকেতে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। প্রথম ম্যাচের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের সামনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের অবিশ্বাস্য সুযোগ রয়েছে।
ডারউইনের জয় তাই শুধু একটি টেস্ট জয়ের হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ পথচলায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগে সমন্বিত পারফরম্যান্স দেখিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, বড় দলের বিপক্ষে তাদের লড়াই এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব সম্ভাবনাও।
ফলাফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪
বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ৫৭/১
লক্ষ্য: ৫৭ রান
সিরিজ: বাংলাদেশ ১-০ এগিয়ে
ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ — ম্যাচে ৯ উইকেট























