জায়গা-জমি ও স্থায়ী আয় নেই, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে দিনে আয় ৫০–৮০ টাকা; একঘরে জায়গা না হওয়ায় স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা থাকছেন ভোলা
উন্নয়নের আড়ালে জীর্ণ ঘরে ভোলার জীবন, পাশে দাঁড়াবে কে?
- আপডেট সময় : ০৩:৫১:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

মণিরামপুর, যশোর | ২৪ আগস্ট ২০২৬ : যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ৫ নম্বর হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের নিখিল বৈরাগী ওরফে ‘ভোলা’র জীবন যেন উন্নয়নের গল্পের বাইরে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা। জীর্ণ ও অস্থায়ী ঘর, নিজের নামে জায়গা-জমি নেই, নেই স্থায়ী আয়ের কোনো ব্যবস্থা। স্ত্রীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটছে তার।
স্থানীয়দের ভাষ্য ও পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা ভোলা জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন চায়ের দোকানে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে দেন। দিনভর পরিশ্রমের বিনিময়ে তার আয় হয় মাত্র ৫০ থেকে ৮০ টাকা। সেই সামান্য অর্থ দিয়েই কোনোভাবে সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হয়।
ভোলার একমাত্র ছেলে মহাদেব বৈরাগীর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার নিজেরও নেই কোনো জমিজমা বা স্থায়ী কর্মসংস্থান। অন্যের মাছের ঘেরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যে আয় করেন, তা দিয়ে নিজের পরিবারের খাবার ও অন্যান্য খরচ চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়।
এক ঘরে জায়গা হয়নি দুই পরিবারেরঃ
পিতা-পুত্রের সামর্থ্যের সম্মিলিত চেষ্টায় একটি ছোট একখোপের ঘর তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সেই ঘরেও মহাদেবের স্ত্রী-সন্তানসহ থাকার জায়গা সংকুলান হয় না। ফলে নিজেদের সম্মতিতেই ভোলা ও তার স্ত্রী আলাদাভাবে বাইরে অবস্থান করছেন।
পরিবারটির এই আলাদা থাকা কোনো স্বাভাবিক পছন্দ নয়; বরং দারিদ্র্য ও আবাসন সংকটের কাছে তাদের এক ধরনের বাধ্যতামূলক সমঝোতা।
একই পরিবারের দুই প্রজন্মের জীবন যেন একই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে আছে। একদিকে মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করা ভোলা, অন্যদিকে সম্পদ ও স্থায়ী কর্মসংস্থানহীন তার ছেলে মহাদেব।
কারও খাবারের মেনুতে বাহারি আয়োজন, ভোলাদের পাতে এক তরকারিঃ সমাজের অনেক পরিবারের সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারে নানা ধরনের পদ থাকলেও ভোলাদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, একবেলার খাবারে যে এক তরকারি জোটে, সেটি দিয়েই কোনোভাবে দিন পার করতে হয়।
মাছ-মাংস তাদের কাছে নিয়মিত খাবার নয়, বরং সামর্থ্যের বাইরে থাকা বিলাসিতা। যেখানে পেট ভরাট করাই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা পাওয়া তাদের জন্য আরও কঠিন।
সরকারি সহায়তা পান না ভোলাঃ পরিবারটির সরকারি সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সজল মল্লিক জানান, নিখিল বৈরাগী ওরফে ভোলা কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পান না।
সরকারি হরিদাসকাটি ইউনিয়নের ওয়েবসাইটে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের কয়েকজন হতদরিদ্র ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে প্রকাশিত ওই তালিকায় নিখিল বৈরাগীর নাম পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন—যে পরিবারটির মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই নেই, নিয়মিত আয় নেই এবং খাদ্যের নিশ্চয়তাও নেই, সেই পরিবার কীভাবে সামাজিক নিরাপত্তার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে?
সহায়তার উদ্যোগ চান স্থানীয়রাঃ স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি চরম কষ্টে দিন কাটালেও তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন কিংবা সরকারি সহায়তার আওতায় আনার দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অথচ অসহায়, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের উদ্যোগ রয়েছে। ভোলার মতো মানুষের ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচির আওতায় যোগ্যতা যাচাই করে সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আশ্রয় নয়, চান একটু বাঁচার সুযোগঃ ভোলার পরিবারের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা বিলাসবহুল জীবন চান না, চান না বড় বাড়ি কিংবা বিপুল সম্পদ। তাদের চাওয়া—একটি নিরাপদ আশ্রয়, সরকারি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মণিরামপুর উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করবেন। পরিবারের প্রকৃত আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা যাচাই করে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্য সহায়তা, নিরাপদ বাসস্থান, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেনকে অবগত করা হলে তিনি বিষয়টি দ্রুত দেখবেন বলে জানিয়েছেন। সরকারি উপজেলা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, মো. সম্রাট হোসেন মণিরামপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভোলার জন্য একটি নিরাপদ ঘর কিংবা একবেলা পুষ্টিকর খাবার কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তার স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন।
একদিকে উন্নয়ন ও অবকাঠামোর পরিবর্তন, অন্যদিকে জীর্ণ ঘরে অনিশ্চিত জীবন—এই বৈপরীত্যের মধ্যেই দিন কাটছে ভোলার। এখন স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—ভোলার পাশে দাঁড়াবে কে?














