শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি সামিউলের পড়াশোনা, প্রতিদিন হুইলচেয়ার ঠেলে বন্ধুকে স্কুলে পৌঁছে দেয় মোহাম্মদ
রাজিবপুরে ৭ বছরের দুই শিশুর অনন্য বন্ধুত্ব, কাঁধে বই হাতে হুইলচেয়ার ঠেলে স্কুলে নেয় মোহাম্মদ
- আপডেট সময় : ০২:৪৯:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে

রাজিবপুর (কুড়িগ্রাম) | ২০ আগস্ট ২০২৬ঃ কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের তিনথোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পথে প্রতিদিনই দেখা মেলে হৃদয়ছোঁয়া এক দৃশ্যের। কাঁধে নিজের বইভর্তি ব্যাগ, আর হাতে বন্ধুর হুইলচেয়ারের হাতল—এভাবেই প্রতিদিন সাত বছরের সামিউলকে স্কুলে নিয়ে যায় তার সমবয়সী বন্ধু মোহাম্মদ। দুই শিশুর এই নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বে মুগ্ধ এলাকাবাসী।
সামিউল জন্মগতভাবে একটি পা না থাকায় হুইলচেয়ারের সাহায্যে চলাফেরা করে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ও স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা অটুট। বন্ধুর সহযোগিতায় প্রতিদিন নিয়ম করে বিদ্যালয়ে যায় সে।
সামিউল ও মোহাম্মদের বাড়ি থেকে তিনথোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার। প্রতিদিন সকালে নিজের বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে মোহাম্মদ বন্ধুর হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়ায়। এরপর হুইলচেয়ার ঠেলে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সামিউলকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়। ক্লাস শেষে আবার বন্ধুকে নিয়ে একইভাবে বাড়ির পথে ফেরে সে।
সাত বছরের মোহাম্মদ বলে, “আমার বন্ধু আমার সব। প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারলে আমার অনেক ভালো লাগে।”
শিশুটির সরল কথায় ফুটে ওঠে বন্ধুত্বের প্রতি তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসা।
সামিউলের বাবা বলেন, “প্রতিদিন মোহাম্মদ আমার ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যায়। এতে আমি খুবই খুশি। ওরা দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করে, একসঙ্গে স্কুলে যায়—এটা একজন বাবা হিসেবে আমার জন্য অনেক আনন্দের।”
তিনথোপাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমির হোসেন বলেন, “সামিউল পড়াশোনায় অনেক মেধাবী। তার শুধু একটি পা নেই। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে কৃত্রিম পা সংযোজন করা গেলে সে সাধারণ মানুষের মতো হাঁটাচলা করতে পারবে বলে আমরা আশা করি।”
বিদ্যালয় সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সামিউলের পড়াশোনার আগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। নিজের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনায়ও মনোযোগী। তার মেধা, আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহে মুগ্ধ শিক্ষক-সহপাঠীসহ স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বলেন, “প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের বোঝা নয়। তাদের যথাযথ সুযোগ ও সহযোগিতা দেওয়া গেলে তারাই একদিন দেশের সম্পদ ও শক্তিতে পরিণত হতে পারে।”
তিনি সামিউলের উন্নত চিকিৎসা, কৃত্রিম পা সংযোজন এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সামিউলের স্কুলে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা এবং বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদের প্রতিদিনের সহযোগিতা এখন স্থানীয় মানুষের কাছে মানবিকতার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মাত্র সাত বছর বয়সেই দুই শিশু যেন সমাজকে একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে—বন্ধুত্ব শুধু আনন্দ ভাগাভাগি করার নাম নয়; বন্ধুর প্রয়োজনের সময় তার পাশে দাঁড়ানো, তার পথ সহজ করে দেওয়াই প্রকৃত বন্ধুত্ব।














