চট্টগ্রাম ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিঃ
বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় আধুনিক সকল ফিচার যুক্ত  জাতীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং মাল্টিমিডিয়া দৈনিক সারাদেশ ৭১  নিউজ পোর্টালে আপনাকে স্বাগতম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধনের আবেদনের  জন্য অপেক্ষমান দেশের অন্যতম প্রথম সারির অনলাইন পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়ার জন্য সংবাদদাতা আবশ্যক, বিশেষ সংবাদদাতা (৪),  ক্রাইম রিপোর্টার (৫), স্টাফ রিপোর্টার (১০), বিভাগীয় ব্যুরো (৩) উপজেলা প্রতিনিধি (১০), বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি (৪),  মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার (সকল জেলা ও উপজেলার জন্য) (১০) ইউনিয়ন প্রতিনিধি (৫)  আবেদনের জন্য সিভি, জাতীয় পরিচয় পত্র, আবেদন পাঠাবেন saradesh71@gmail.com এই মেইলে।
সংবাদ শিরোনামঃ
বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় শাড়ি-কসমেটিক্সসহ ৫ লাখ ৮১ হাজার টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ ডবলমুরিং-হালিশহরে মাদক, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা চেয়ে আবেদন রংপুরের নতুন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানকে জেলা কংগ্রেসের ফুলেল শুভেচ্ছা রাণীশংকৈলে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত, পতাকা উত্তোলন ও বৃক্ষরোপণ দামুড়হুদায় মটর চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চোরের মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হরিরামপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতীবান্ধা-পাটগ্রামে বিজিবির পৃথক অভিযান, উদ্ধার ভারতীয় পণ্য নজরুল বর্ষ ঘিরে পীরগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজন বিদ্রোহী কবির চেতনায় উখিয়ায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা

নিজের সঞ্চয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে জীবনভর সংগ্রাম; অসুস্থতা ও অর্থসংকটের মধ্যেও থামেনি তাঁর স্বপ্ন

গোপালগঞ্জের রেখা রানী ওঝা: বিয়ে নয়, মেয়েদের শিক্ষায় জীবন উৎসর্গ করে অনন্য দৃষ্টান্ত

লুৎফর সিকদার
  • আপডেট সময় : ০২:৩৮:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
সারাদেশ ৭১ নিউজ – নির্ভরযোগ্য অনলাইন সংবাদ মাধ্যম গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গোপালগঞ্জ | ২০ আগস্ট ২০২৬ : বিয়ে-সংসারের প্রচলিত জীবনের বদলে নিজের পুরো জীবনকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য উৎসর্গ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার রেখা রানী ওঝা। সরকারি হাসপাতালের নার্স হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’। প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে তাঁর এই উদ্যোগ এখন অনুপ্রেরণার নাম।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামের বাসিন্দা রেখা রানী ওঝার জন্ম ১৯৪৮ সালে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে একপর্যায়ে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে তিনি শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান।

একসময় নার্সিং শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২০১১ সালে অবসর নেন।

অবসর নেওয়ার পর নিজের গ্রামে ফিরে রেখা রানী উপলব্ধি করেন, প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও সহজলভ্য শিক্ষার সুযোগ কতটা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যেতে না পারায় পড়াশোনা ছেড়ে দেয় বা অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হয়। এই বাস্তবতা থেকেই মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান তিনি।

নিজের অবসরের এককালীন অর্থ ও সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বুরুয়া গ্রামে জমি কিনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রেখা রানী ওঝা। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল ২০১৩/২০১৪ সাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি পাঠদানের অনুমতি পায়। বিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’।

শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি তিনি। প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার জন্য নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন না নেওয়ার নীতিও অনুসরণ করেছেন তিনি। ফলে বিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে দীর্ঘদিন তাঁকেই ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২৩০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছিলেন। তখন ৮ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল এবং অনেকে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন।

রেখা রানীর এই সংগ্রাম শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি একজন নারীর নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অন্য মেয়েদের জন্য শিক্ষার পথ তৈরি করার গল্প। যে নারী নিজের শৈশবে শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে অন্য মেয়েরা যেন একই সংকটে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেছেন।

জীবনে বিয়ে না করে মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কাজকেই নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন রেখা রানী। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবার ও ভাই-বোনদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর নিজের জীবনও সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর গুরুতর অসুস্থতার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) বিদ্যালয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা অনুদান দেয় এবং দুই অনাথ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।

রেখা রানীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি যেন একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সংকট কমবে এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ আরও টেকসই হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর।

স্থানীয় মানুষের কাছে রেখা রানী ওঝা তাই শুধু একজন সাবেক নার্স নন; তিনি একজন শিক্ষানুরাগী, সমাজহিতৈষী ও সংগ্রামী নারী। নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদের কথা না ভেবে মেয়েদের শিক্ষার জন্য সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অনুকরণীয়।

রেখা রানীর জীবন যেন একটি বার্তাই দেয়—একজন মানুষের ইচ্ছা, সাহস ও মানবিক উদ্যোগ একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রীই যেন সেই স্বপ্নের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নিজের সঞ্চয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে জীবনভর সংগ্রাম; অসুস্থতা ও অর্থসংকটের মধ্যেও থামেনি তাঁর স্বপ্ন

গোপালগঞ্জের রেখা রানী ওঝা: বিয়ে নয়, মেয়েদের শিক্ষায় জীবন উৎসর্গ করে অনন্য দৃষ্টান্ত

আপডেট সময় : ০২:৩৮:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

গোপালগঞ্জ | ২০ আগস্ট ২০২৬ : বিয়ে-সংসারের প্রচলিত জীবনের বদলে নিজের পুরো জীবনকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য উৎসর্গ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার রেখা রানী ওঝা। সরকারি হাসপাতালের নার্স হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’। প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে তাঁর এই উদ্যোগ এখন অনুপ্রেরণার নাম।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামের বাসিন্দা রেখা রানী ওঝার জন্ম ১৯৪৮ সালে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে একপর্যায়ে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে তিনি শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান।

একসময় নার্সিং শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ২০১১ সালে অবসর নেন।

অবসর নেওয়ার পর নিজের গ্রামে ফিরে রেখা রানী উপলব্ধি করেন, প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও সহজলভ্য শিক্ষার সুযোগ কতটা প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যেতে না পারায় পড়াশোনা ছেড়ে দেয় বা অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হয়। এই বাস্তবতা থেকেই মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান তিনি।

নিজের অবসরের এককালীন অর্থ ও সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বুরুয়া গ্রামে জমি কিনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রেখা রানী ওঝা। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল ২০১৩/২০১৪ সাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি পাঠদানের অনুমতি পায়। বিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’।

শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থাকেননি তিনি। প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনার জন্য নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন না নেওয়ার নীতিও অনুসরণ করেছেন তিনি। ফলে বিদ্যালয়টির নিজস্ব আয় না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে দীর্ঘদিন তাঁকেই ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ২৩০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছিলেন। তখন ৮ জন শিক্ষক ও ৩ জন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল এবং অনেকে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন।

রেখা রানীর এই সংগ্রাম শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি একজন নারীর নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অন্য মেয়েদের জন্য শিক্ষার পথ তৈরি করার গল্প। যে নারী নিজের শৈশবে শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে অন্য মেয়েরা যেন একই সংকটে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেছেন।

জীবনে বিয়ে না করে মেয়েদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কাজকেই নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন রেখা রানী। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবার ও ভাই-বোনদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর নিজের জীবনও সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর গুরুতর অসুস্থতার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) বিদ্যালয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা অনুদান দেয় এবং দুই অনাথ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।

রেখা রানীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি যেন একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সংকট কমবে এবং দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ আরও টেকসই হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর।

স্থানীয় মানুষের কাছে রেখা রানী ওঝা তাই শুধু একজন সাবেক নার্স নন; তিনি একজন শিক্ষানুরাগী, সমাজহিতৈষী ও সংগ্রামী নারী। নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদের কথা না ভেবে মেয়েদের শিক্ষার জন্য সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অনুকরণীয়।

রেখা রানীর জীবন যেন একটি বার্তাই দেয়—একজন মানুষের ইচ্ছা, সাহস ও মানবিক উদ্যোগ একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রীই যেন সেই স্বপ্নের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।