সরেজমিনে বন উজাড়ের আলামত পেল প্রশাসন; আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
আদালতের স্থিতাবস্থা অমান্যের অভিযোগ: কুলাউড়ার ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টে গাছ কেটে বনভূমি দখলের চেষ্টা
- আপডেট সময় : ১০:৪৭:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে

মৌলভীবাজার | ১ আগস্ট ২০২৬: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া রেঞ্জাধীন বরমাচল বিটের ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্ট (ব্লক-২) এলাকায় প্রায় ১৫০ একর সরকারি সংরক্ষিত বনভূমিতে আদালতের স্থিতাবস্থা (Status Quo) আদেশ উপেক্ষা করে বন উজাড়, গাছ কাটা এবং জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র, প্রশাসন ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় সংঘাত, জবরদখল ও বনভূমি ধ্বংসের অভিযোগ চলে আসছে।
সম্প্রতি অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কুলাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস। অভিযানের সময় বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিনে বন উজাড়ের আলামত, তাজা গাছ কাটার চিহ্ন এবং সুপারি চারা রোপণের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।
অভিযান চলাকালে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য চন্দন কুর্মি এবং ইচ্ছালছড়া পান পুঞ্জির প্রধান (মন্ত্রী) লিডিয়া পিয়া গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে প্রশাসনের দাবি, সরেজমিনে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে হাতেনাতে পাওয়া না যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানেও বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গাছ কাটার চিহ্ন ও বনভূমি পরিষ্কার করার আলামত দেখা গেছে। তবে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংযুক্ত সরকারি নথি ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৩৭১, তারিখ: ২৫ জুলাই ২০২৬ এবং জিডি নং-৯৮২, তারিখ: ২০ জুলাই ২০২৪) অনুযায়ী, কুলাউড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে স্বত্ব মামলা নং-১৮৫/২০২২ বিচারাধীন রয়েছে। জেলা জজ আদালত সংশ্লিষ্ট জমিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কয়েকজন ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীরা রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় প্রবেশ করে বনভূমি দখল ও জুম চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বন বিভাগের দাবি, সরকারি দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটছে। বরমাচল বিট কর্মকর্তা (ফরেস্টার) মো. আবদুল ওয়াদুদ এ বিষয়ে একাধিক সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমেও সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস বলেন, “সরেজমিনে বন উজাড়ের আলামত পাওয়া গেছে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সরকারি জমিতে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুলাউড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা রবীন্দ্র কুমার সিংহ জানান, বন বিভাগ জনবল সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও সরকারি বনভূমি রক্ষায় কাজ করছে। বিষয়টি পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ অমান্য করে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি দখল বা গাছ কাটার কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সচেতন মহলের দাবি, বন বিভাগের জনবল সংকট এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় অবৈধ দখলচেষ্টা চলতে থাকায় বন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা দ্রুত কার্যকর অভিযান, দখলমুক্তকরণ এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, সংরক্ষিত বনভূমি শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, স্থানীয় জলবায়ু ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম ভিত্তি। তাই আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং বনভূমি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।














