সন্তান হারানোর শোক, স্বামীর তালাক ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় মৌলভীবাজারের জুড়ীতে দুই সহোদরার দীর্ঘ শিকলবন্দী জীবন; মানবিক সহায়তার আবেদন।
মৌলভীবাজারে দেড় দশক ধরে শিকলবন্দী দুই বোন: সন্তান হারিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন আফিয়া-রোবেনার মানবিক সহায়তার আকুতি
- আপডেট সময় : ০৩:৫৪:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর (চাক্কাটিলা) গ্রামে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শিকলবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন দুই সহোদরা আফিয়া খাতুন (৩৫) ও রোবেনা বেগম (২৮)। পরিবারের দাবি, গর্ভের সন্তান হারানোর গভীর মানসিক আঘাতের পর তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পরে স্বামীর তালাক, দারিদ্র্য এবং দীর্ঘদিনের চিকিৎসাহীনতায় তাদের জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে একটি ছোট ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই বোনের মা জামিনা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে ভিক্ষা করে সংসার চালান। প্রায় ২৫ বছর আগে তার দিনমজুর স্বামী মারা গেলে তিন মেয়েকে নিয়ে চরম কষ্টে জীবনযাপন শুরু করেন। আর্থিক সংকটের মধ্যেও মেয়েদের বিয়ে দিলেও ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় মেয়ে আফিয়া খাতুনকে পার্শ্ববর্তী বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকায় বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের এক বছর পর মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনায় তিনি গভীর মানসিক আঘাত পান। এরপর ধীরে ধীরে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে তার স্বামী তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন এবং পরে তালাক দেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাকে নিরাপত্তার স্বার্থে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে বাধ্য হন। প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে তিনি এভাবেই জীবন কাটাচ্ছেন।
একই ধরনের ট্র্যাজেডির শিকার হন ছোট বোন রোবেনা বেগম। তাকে পশ্চিম হরিরামপুর গ্রামে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সন্তান প্রসবের সময় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন হাসপাতালেই তাকে রেখে চলে যান। পরে বৃদ্ধা মা ভিটেমাটি বিক্রি ও ভিক্ষা করে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কিছুদিনের মধ্যেই রোবেনাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং পরবর্তীতে স্বামী তাকে তালাক দেন। গত ৭ থেকে ৮ বছর ধরে তিনিও শিকলবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ঘরের পাশে একটি অস্বাস্থ্যকর একচালা কক্ষে বসবাস করছেন দুই বোন। কখনো শিকল খুলে দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়, যাতে তারা বাইরে গিয়ে হারিয়ে না যান বা কোনো দুর্ঘটনার শিকার না হন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মা জামিনা খাতুন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মেয়েদের পরিচর্যা করলেও উন্নত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জামিনা খাতুন বলেন, “ভিক্ষা করে পেটের ভাত জোগাতেই কষ্ট হয়। চিকিৎসা করাব কী দিয়ে? কোথায় ভালো ডাক্তার আছেন তাও জানি না। আমি একা মানুষ। যদি সমাজের মানুষ একটু সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো আমার মেয়েরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।”
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবকালীন বা সন্তান হারানোর পর সৃষ্ট তীব্র মানসিক আঘাত থেকে গুরুতর মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে। তবে যথাসময়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, ওষুধ, কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক সহায়তা পেলে অনেক রোগীই উন্নতি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে আফিয়া ও রোবেনার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পরিবারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মানবিক সহায়তা বা চিকিৎসার জন্য যোগাযোগ করা যাবে বিকাশ (পার্সোনাল): ০১৭৮৫-৬৬৬০১০ (জামিনা খাতুন) নম্বরে। অনুদান দেওয়ার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।














