চট্টগ্রাম ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিঃ
বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় আধুনিক সকল ফিচার যুক্ত  জাতীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং মাল্টিমিডিয়া দৈনিক সারাদেশ ৭১  নিউজ পোর্টালে আপনাকে স্বাগতম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধনের আবেদনের  জন্য অপেক্ষমান দেশের অন্যতম প্রথম সারির অনলাইন পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়ার জন্য সংবাদদাতা আবশ্যক, বিশেষ সংবাদদাতা (৪),  ক্রাইম রিপোর্টার (৫), স্টাফ রিপোর্টার (১০), বিভাগীয় ব্যুরো (৩) উপজেলা প্রতিনিধি (১০), বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি (৪),  মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার (সকল জেলা ও উপজেলার জন্য) (১০) ইউনিয়ন প্রতিনিধি (৫)  আবেদনের জন্য সিভি, জাতীয় পরিচয় পত্র, আবেদন পাঠাবেন saradesh71@gmail.com এই মেইলে।
সংবাদ শিরোনামঃ
বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় শাড়ি-কসমেটিক্সসহ ৫ লাখ ৮১ হাজার টাকার চোরাচালানি পণ্য জব্দ ডবলমুরিং-হালিশহরে মাদক, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা চেয়ে আবেদন রংপুরের নতুন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানকে জেলা কংগ্রেসের ফুলেল শুভেচ্ছা রাণীশংকৈলে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত, পতাকা উত্তোলন ও বৃক্ষরোপণ দামুড়হুদায় মটর চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চোরের মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হরিরামপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতীবান্ধা-পাটগ্রামে বিজিবির পৃথক অভিযান, উদ্ধার ভারতীয় পণ্য নজরুল বর্ষ ঘিরে পীরগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজন বিদ্রোহী কবির চেতনায় উখিয়ায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা

দুর্যোগে ত্রাণ, নগদ সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পুনর্বাসন—দেশজুড়ে কাজ করা রেড ক্রিসেন্টের অর্থায়ন, উপকারভোগী নির্বাচন ও বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগের তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা

ত্রাণ থেকে নগদ সহায়তা: রেড ক্রিসেন্টের কার্যক্রম নিয়ে যত প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:৫০:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
সারাদেশ ৭১ নিউজ – নির্ভরযোগ্য অনলাইন সংবাদ মাধ্যম গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দুর্যোগ, সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত মানবিক সংগঠন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS)। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে রেড ক্রিসেন্টের কাজ কীভাবে পরিচালিত হয়, অর্থ ও সহায়তা কোথা থেকে আসে, কীভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ে এর ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে কী ধরনের অভিযোগ উঠেছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি হিসেবে এটি ৩১ মার্চ ১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৬-এর মাধ্যমে গঠিত হয় এবং এর কার্যকারিতা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে প্রযোজ্য ধরা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) প্রতিষ্ঠানটিকে স্বীকৃতি দেয় এবং ২ নভেম্বর ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজে (IFRC) অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৮ সালে আইন অনুযায়ী নাম ও প্রতীক ‘রেড ক্রিসেন্ট’-এ পরিবর্তিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটির জাতীয় সদর দপ্তর ঢাকার বড় মগবাজারে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এর ৬৮টি ইউনিট রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, কেন্দ্রীয় সহায়তা এবং অর্থ ও হিসাব—এ ধরনের বিভিন্ন বিভাগ ও ইউনিটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

রেড ক্রিসেন্টের কাজ শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন জরুরি সাড়া এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন—তিন পর্যায়েই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে।

এর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—

– বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অন্যান্য দুর্যোগে জরুরি ত্রাণ;

– নগদ ও ভাউচার সহায়তা;

– খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ;

– প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা;

– উদ্ধার ও জরুরি সাড়া কার্যক্রম;

– দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস;

– আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি;

– জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা;

– স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ;

– স্বাস্থ্য সচেতনতা;

– রক্তদান ও রক্তসংক্রান্ত সেবা;

– ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর দুর্যোগে সাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক সক্ষমতা উন্নয়ন, কমিউনিটি কার্যক্রম এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Movement Partners ও দাতা সংস্থার সহযোগিতায় ২০২৫ সালে ৩৫টি প্রকল্প চলমান ছিল।

রেড ক্রিসেন্টের মানবিক কার্যক্রমের অর্থায়ন একটি মাত্র উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের অংশীদার, বিভিন্ন দাতা সংস্থা, দেশীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের বার্তাতেও IFRC, ICRC, অংশীদার ন্যাশনাল সোসাইটি, দাতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও অনুদান গ্রহণ করে।

প্রকল্পভেদে অর্থের পরিমাণ ও ব্যবহারের ধরন ভিন্ন। তাই কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা ইউনিটে কত টাকা এসেছে, কোন প্রকল্পে এসেছে, কতজনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব জানতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, হিসাব, ব্যয় বিবরণী ও অডিট নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ হাজার ৭৬৭টি পরিবার, অর্থাৎ আনুমানিক ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৫ জন মানুষকে, মোট ৩২ কোটি ৯৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৮০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই সহায়তা বিভিন্ন জলবায়ুজনিত সংকট—বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোসহ নানা জরুরি পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে। সহায়তার অর্থ এসেছে IFRC, অংশীদার ও দাতাদের সহযোগিতায়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ৩২ কোটি ৯৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৮০ টাকা কোনো একটি জেলা বা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের জন্য বরাদ্দ নয়। এটি ২০২৫ সালে দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রমে দেওয়া নগদ সহায়তার মোট পরিমাণ। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থের ব্যবহার জানতে প্রকল্পভিত্তিক হিসাব দেখতে হবে।

কোনো এলাকায় দুর্যোগ দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের প্রয়োজন নিরূপণের মাধ্যমে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী সম্ভাব্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।

প্রকল্প অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্য, পানি, কম্বল, স্বাস্থ্যসামগ্রী, রান্নার উপকরণ, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী অথবা নগদ অর্থ দেওয়া হতে পারে।

নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অর্থ উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো, তথ্য সংগ্রহ, তালিকা তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে উপকারভোগী নির্বাচনই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কারণ তালিকা তৈরিতে ভুল হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বাদ পড়তে পারেন এবং তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত বা অযোগ্য কেউ সহায়তা পেতে পারেন।

মানবিক সহায়তা বিতরণ নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া উপকারভোগী এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

রেড ক্রিসেন্টের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর-পরবর্তী মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ তুলে একটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছিল। সেখানে ত্রাণের তালিকা ও বিতরণে স্বজনপ্রীতি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ পড়া এবং কিছু এলাকায় অতিরিক্ত ও কিছু এলাকায় অপর্যাপ্ত সহায়তার মতো সমস্যার কথা উঠে আসে। ওই পর্যবেক্ষণ ছিল বৃহত্তর মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে; এটিকে রেড ক্রিসেন্টের বর্তমান কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।

২০১৬ সালে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণ পাওয়ার জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ সংবাদে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০০টি বন্যাকবলিত পরিবারের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং ১৮ জন উপকারভোগী লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এবং স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাদের সদস্য নন। ফলে ঘটনাটি রেড ক্রিসেন্টের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীর বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে নয়, বরং রেড ক্রিসেন্টের নাম ব্যবহার করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

২০০৮ সালে সাবেক বিএনপি নেতা শাহিদুল হক জামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের সময় তার বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, আত্মসাৎ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এগুলো ছিল অভিযোগ ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট দাবি; সেগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

না। অভিযোগ, অনুসন্ধান, তদন্ত এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ—এগুলো আলাদা বিষয়।

কোনো রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট, কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় প্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করতে অন্তত কয়েকটি নথি দেখা প্রয়োজন—

১. উপকারভোগীর তালিকা;

২. ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের প্রতিবেদন;

৩. প্রকল্পের বরাদ্দপত্র;

৪. ত্রাণ বিতরণের রেজিস্টার বা ডিজিটাল রেকর্ড;

৫. ক্রয় ও সরবরাহের কাগজপত্র;

৬. ব্যাংক বা নগদ অর্থ প্রদানের রেকর্ড;

৭. প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী;

৮. অডিট রিপোর্ট;

৯. অভিযোগের লিখিত নথি;

১০. সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য।

এ ধরনের নথি ছাড়া শুধু স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ।

রেড ক্রিসেন্টের মতো মানবিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগের সময় সংগৃহীত অর্থ ও সহায়তা মূলত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য।

একটি প্রকল্পে কত টাকা এসেছে, অর্থের উৎস কী, কতজন উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে, প্রত্যেকে কী পরিমাণ সহায়তা পেয়েছেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয়েছে—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তালিকা থেকে বাদ পড়লে কিংবা কেউ অনিয়মের অভিযোগ তুললে তার অভিযোগ যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নিজেও মানবিক কার্যক্রমে নিরপেক্ষতা, মানবিকতা, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাসেবা ও অন্যান্য মৌলিক নীতির প্রতি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে।

কোনো এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের সহায়তা কার্যক্রম চললে স্থানীয় মানুষ কয়েকটি তথ্য জানতে চাইতে পারেন—

– কোন প্রকল্পের আওতায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে;

– প্রকল্পের অর্থের উৎস কী;

– কারা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য;

– উপকারভোগীর তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে;

– প্রত্যেক পরিবার কত টাকা বা কী ধরনের সহায়তা পাবে;

– অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কোথায়।

কেউ যোগ্য হয়েও সহায়তা থেকে বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। আর অনিয়মের অভিযোগ থাকলে ছবি, ভিডিও, রসিদ, তালিকা, নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের মতো প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্যোগের সময় ত্রাণ বা নগদ সহায়তা পাওয়া একজন মানুষের কাছে শুধু অর্থের বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটিই তার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান অবলম্বন।

তাই কত টাকা বরাদ্দ হলো—তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ সঠিক ব্যক্তির কাছে, সঠিক সময়ে এবং নির্ধারিত পরিমাণে পৌঁছেছে কি না।

স্বচ্ছ উপকারভোগী তালিকা, প্রকল্পভিত্তিক হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত অডিট, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ তদারকি থাকলে মানবিক সহায়তায় অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ওই বছর দেশজুড়ে ২৪ হাজার ৭৬৭ পরিবারকে প্রায় ৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা নগদ সহায়তা দিয়েছে। এই পরিমাণ অর্থের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি প্রকল্পে তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বও অনেক বেশি।

মানবিক সহায়তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়। এটি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। ফলে রেড ক্রিসেন্টের প্রতিটি কার্যক্রমে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, প্রমাণভিত্তিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুর্যোগে ত্রাণ, নগদ সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পুনর্বাসন—দেশজুড়ে কাজ করা রেড ক্রিসেন্টের অর্থায়ন, উপকারভোগী নির্বাচন ও বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগের তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা

ত্রাণ থেকে নগদ সহায়তা: রেড ক্রিসেন্টের কার্যক্রম নিয়ে যত প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১১:৫০:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

দুর্যোগ, সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত মানবিক সংগঠন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS)। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে রেড ক্রিসেন্টের কাজ কীভাবে পরিচালিত হয়, অর্থ ও সহায়তা কোথা থেকে আসে, কীভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ে এর ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে কী ধরনের অভিযোগ উঠেছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি হিসেবে এটি ৩১ মার্চ ১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৬-এর মাধ্যমে গঠিত হয় এবং এর কার্যকারিতা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে প্রযোজ্য ধরা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) প্রতিষ্ঠানটিকে স্বীকৃতি দেয় এবং ২ নভেম্বর ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজে (IFRC) অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৮ সালে আইন অনুযায়ী নাম ও প্রতীক ‘রেড ক্রিসেন্ট’-এ পরিবর্তিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটির জাতীয় সদর দপ্তর ঢাকার বড় মগবাজারে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এর ৬৮টি ইউনিট রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, কেন্দ্রীয় সহায়তা এবং অর্থ ও হিসাব—এ ধরনের বিভিন্ন বিভাগ ও ইউনিটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

রেড ক্রিসেন্টের কাজ শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন জরুরি সাড়া এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন—তিন পর্যায়েই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে।

এর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—

– বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অন্যান্য দুর্যোগে জরুরি ত্রাণ;

– নগদ ও ভাউচার সহায়তা;

– খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ;

– প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা;

– উদ্ধার ও জরুরি সাড়া কার্যক্রম;

– দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস;

– আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি;

– জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা;

– স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ;

– স্বাস্থ্য সচেতনতা;

– রক্তদান ও রক্তসংক্রান্ত সেবা;

– ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর দুর্যোগে সাড়া, স্বাস্থ্যসেবা, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক সক্ষমতা উন্নয়ন, কমিউনিটি কার্যক্রম এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Movement Partners ও দাতা সংস্থার সহযোগিতায় ২০২৫ সালে ৩৫টি প্রকল্প চলমান ছিল।

রেড ক্রিসেন্টের মানবিক কার্যক্রমের অর্থায়ন একটি মাত্র উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের অংশীদার, বিভিন্ন দাতা সংস্থা, দেশীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের বার্তাতেও IFRC, ICRC, অংশীদার ন্যাশনাল সোসাইটি, দাতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও অনুদান গ্রহণ করে।

প্রকল্পভেদে অর্থের পরিমাণ ও ব্যবহারের ধরন ভিন্ন। তাই কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা ইউনিটে কত টাকা এসেছে, কোন প্রকল্পে এসেছে, কতজনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব জানতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, হিসাব, ব্যয় বিবরণী ও অডিট নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ হাজার ৭৬৭টি পরিবার, অর্থাৎ আনুমানিক ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৫ জন মানুষকে, মোট ৩২ কোটি ৯৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৮০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই সহায়তা বিভিন্ন জলবায়ুজনিত সংকট—বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোসহ নানা জরুরি পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে। সহায়তার অর্থ এসেছে IFRC, অংশীদার ও দাতাদের সহযোগিতায়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ৩২ কোটি ৯৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৮০ টাকা কোনো একটি জেলা বা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের জন্য বরাদ্দ নয়। এটি ২০২৫ সালে দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্যক্রমে দেওয়া নগদ সহায়তার মোট পরিমাণ। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থের ব্যবহার জানতে প্রকল্পভিত্তিক হিসাব দেখতে হবে।

কোনো এলাকায় দুর্যোগ দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের প্রয়োজন নিরূপণের মাধ্যমে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী সম্ভাব্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।

প্রকল্প অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্য, পানি, কম্বল, স্বাস্থ্যসামগ্রী, রান্নার উপকরণ, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী অথবা নগদ অর্থ দেওয়া হতে পারে।

নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অর্থ উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো, তথ্য সংগ্রহ, তালিকা তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে উপকারভোগী নির্বাচনই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কারণ তালিকা তৈরিতে ভুল হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বাদ পড়তে পারেন এবং তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত বা অযোগ্য কেউ সহায়তা পেতে পারেন।

মানবিক সহায়তা বিতরণ নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া উপকারভোগী এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

রেড ক্রিসেন্টের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর-পরবর্তী মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ তুলে একটি পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছিল। সেখানে ত্রাণের তালিকা ও বিতরণে স্বজনপ্রীতি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ পড়া এবং কিছু এলাকায় অতিরিক্ত ও কিছু এলাকায় অপর্যাপ্ত সহায়তার মতো সমস্যার কথা উঠে আসে। ওই পর্যবেক্ষণ ছিল বৃহত্তর মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে; এটিকে রেড ক্রিসেন্টের বর্তমান কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।

২০১৬ সালে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নে রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণ পাওয়ার জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ সংবাদে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০০টি বন্যাকবলিত পরিবারের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং ১৮ জন উপকারভোগী লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এবং স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাদের সদস্য নন। ফলে ঘটনাটি রেড ক্রিসেন্টের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীর বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে নয়, বরং রেড ক্রিসেন্টের নাম ব্যবহার করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

২০০৮ সালে সাবেক বিএনপি নেতা শাহিদুল হক জামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের সময় তার বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, আত্মসাৎ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এগুলো ছিল অভিযোগ ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট দাবি; সেগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

না। অভিযোগ, অনুসন্ধান, তদন্ত এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ—এগুলো আলাদা বিষয়।

কোনো রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট, কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় প্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করতে অন্তত কয়েকটি নথি দেখা প্রয়োজন—

১. উপকারভোগীর তালিকা;

২. ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের প্রতিবেদন;

৩. প্রকল্পের বরাদ্দপত্র;

৪. ত্রাণ বিতরণের রেজিস্টার বা ডিজিটাল রেকর্ড;

৫. ক্রয় ও সরবরাহের কাগজপত্র;

৬. ব্যাংক বা নগদ অর্থ প্রদানের রেকর্ড;

৭. প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী;

৮. অডিট রিপোর্ট;

৯. অভিযোগের লিখিত নথি;

১০. সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য।

এ ধরনের নথি ছাড়া শুধু স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ।

রেড ক্রিসেন্টের মতো মানবিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্যোগের সময় সংগৃহীত অর্থ ও সহায়তা মূলত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য।

একটি প্রকল্পে কত টাকা এসেছে, অর্থের উৎস কী, কতজন উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে, প্রত্যেকে কী পরিমাণ সহায়তা পেয়েছেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কত টাকা খরচ হয়েছে—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তালিকা থেকে বাদ পড়লে কিংবা কেউ অনিয়মের অভিযোগ তুললে তার অভিযোগ যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নিজেও মানবিক কার্যক্রমে নিরপেক্ষতা, মানবিকতা, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাসেবা ও অন্যান্য মৌলিক নীতির প্রতি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে।

কোনো এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের সহায়তা কার্যক্রম চললে স্থানীয় মানুষ কয়েকটি তথ্য জানতে চাইতে পারেন—

– কোন প্রকল্পের আওতায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে;

– প্রকল্পের অর্থের উৎস কী;

– কারা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য;

– উপকারভোগীর তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে;

– প্রত্যেক পরিবার কত টাকা বা কী ধরনের সহায়তা পাবে;

– অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কোথায়।

কেউ যোগ্য হয়েও সহায়তা থেকে বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। আর অনিয়মের অভিযোগ থাকলে ছবি, ভিডিও, রসিদ, তালিকা, নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের মতো প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্যোগের সময় ত্রাণ বা নগদ সহায়তা পাওয়া একজন মানুষের কাছে শুধু অর্থের বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেটিই তার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান অবলম্বন।

তাই কত টাকা বরাদ্দ হলো—তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ সঠিক ব্যক্তির কাছে, সঠিক সময়ে এবং নির্ধারিত পরিমাণে পৌঁছেছে কি না।

স্বচ্ছ উপকারভোগী তালিকা, প্রকল্পভিত্তিক হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত অডিট, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ তদারকি থাকলে মানবিক সহায়তায় অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ওই বছর দেশজুড়ে ২৪ হাজার ৭৬৭ পরিবারকে প্রায় ৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা নগদ সহায়তা দিয়েছে। এই পরিমাণ অর্থের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি প্রকল্পে তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বও অনেক বেশি।

মানবিক সহায়তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়। এটি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। ফলে রেড ক্রিসেন্টের প্রতিটি কার্যক্রমে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, প্রমাণভিত্তিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।