রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ কয়েক বস্তা ওষুধ ধ্বংসের উদ্যোগ; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা ও উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন
রাজিবপুর হাসপাতালে সরকারি ওষুধ নিয়ে প্রশ্ন, রাতে পোড়ানোর অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১১:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ৫৩ বার পড়া হয়েছে

কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই সোমবার রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মেয়াদোত্তীর্ণ কয়েক বস্তা সরকারি ওষুধ পুড়িয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ সময় বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ওষুধ পুড়িয়ে ফেলার কারণ জানতে চান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহি দাবি করেন বলে জানা গেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো ঠিক কত পরিমাণ ছিল, কোন কোন ওষুধ ছিল, সেগুলোর আর্থিক মূল্য কত এবং সেগুলো ধ্বংসের আগে সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো অনুমোদন বা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় প্রেসক্রিপশনে থাকা প্রয়োজনীয় সরকারি ওষুধ পাওয়া যায় না। বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার আশায় দরিদ্র মানুষ হাসপাতালে এলেও ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে কিনতে হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই হাসপাতালের মজুত সরকারি ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হওয়ার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—রোগীদের প্রয়োজনের সময় যদি ওষুধের সংকট থাকে, তাহলে একই হাসপাতালে সরকারি ওষুধ কীভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হলো?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো পুড়িয়ে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি দেখতে পান। পরে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে ওষুধ ধ্বংসের বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
স্থানীয়দের দাবি, মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ ধ্বংসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না—তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের স্টোর রেজিস্টার, ওষুধ গ্রহণ ও বিতরণের হিসাব এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের তালিকা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
এদিকে হাসপাতালের কর্মকর্তা ডা. সারওয়ার জাহানের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসকের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। এমনকি তার হয়ে ‘লুৎফর রহমান’ নামে একজন হাজিরায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, লুৎফর রহমান একটি প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, সভা বা মিটিংয়ের চিঠি সম্পাদনার মাধ্যমে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট হাজিরা রেজিস্টার, ডিজিটাল উপস্থিতির তথ্য বা প্রশাসনিক নথিও প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবা নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ নিয়ে রোগীদের অভিযোগের কথা উঠে আসে। একই সময়ে কর্মকর্তার প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের কারণে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
তবে বর্তমান সময়ের অভিযোগকে পুরোনো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি একই ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমান অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নতুন করে প্রশাসনিক তদন্ত ও নথি যাচাই প্রয়োজন।
চর রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry-তে রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে অবস্থিত সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
চরাঞ্চলের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের একটি বড় অংশ চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকারি ওষুধের মজুত, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ রোগীদের ওপর।
বর্তমান অভিযোগের পর স্থানীয়দের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় তদন্তের দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
– হাসপাতালে কী পরিমাণ সরকারি ওষুধ মজুত ছিল;
– কোন কোন ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে;
– ওষুধগুলো কবে হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছিল;
– মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কেন সেগুলো রোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি;
– ওষুধ সংরক্ষণ ও স্টক ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না;
– মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংসের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না;
– কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও হাজিরা ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, সিভিল সার্জন কার্যালয় ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্মকর্তা, কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ও উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।














