ধুনটের শহড়াবাড়ি-বানিয়াজান এলাকায় তীব্র নদীভাঙন; জিও ব্যাগ ফেলেও কাটছে না আতঙ্ক, স্থায়ী প্রকল্পের দাবি স্থানীয়দের
যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে ধুনটে ১২ দিনে বিলীন ২০০ মিটার এলাকা, ঝুঁকিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও দুই স্পার
- আপডেট সময় : ০৭:৩৫:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

বগুড়া | ৭ জুলাই ২০২৬ : বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অব্যাহত ভাঙনের কারণে শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান তীররক্ষা স্পারের মধ্যবর্তী অংশে দেখা দিয়েছে চরম ঝুঁকি। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় জনপদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দিনরাত বালিভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম দফায় শহড়াবাড়ি এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়। সে সময় শহড়াবাড়ি ঘাটের ৯টি দোকানসহ বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরে পাউবো জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও প্রায় ১২ দিন আগে আবারও নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, শহড়াবাড়ি স্পারের উজান অংশে ভাঙনের কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। দ্রুত জিও টিউব ও জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এলাকা অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।
উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ন কবির জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তবে শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের মধ্যবর্তী প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিটার এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই অংশে দ্রুত প্রতিরক্ষামূলক কাজ না করলে দুটি স্পার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান এলাকায় যমুনা নদীতে দুটি স্পার নির্মাণ করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন নদীর মূল স্রোত তীর থেকে দূরে থাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিরাপদ ছিল। তবে ২০২১ সালের ভয়াবহ ভাঙনে দুটি স্পারের সামনের প্রায় ৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়। এরপর কয়েক বছর পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও সম্প্রতি আবারও প্রবল স্রোতের কারণে তীররক্ষা কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের বৈশাখী চর, রাঁধানগর, বথুয়ারভিটা, নিউ সারিয়াকান্দি, আটারচর, পুকুরিয়া, ভুতবাড়ি ও কৈয়াগাড়িসহ একাধিক জনপদ অতীতের ভয়াবহ নদীভাঙনে মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে। হাজারো পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নদীতে মাছ ধরা এবং চরাঞ্চলে মৌসুমি ফসল চাষই তাদের প্রধান জীবিকার উৎস।
রবিবার বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তিনি দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাউবোর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন এবং স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে একটি সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে দুই স্পারের মধ্যবর্তী এলাকায় ইজারাকৃত বালুমহাল থেকে নিয়ম না মেনে নদীর ডান তীরঘেঁষা অংশে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে যমুনায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শহড়াবাড়ি স্পারের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজও পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পন্ন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং নিয়মিত নদী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।














