ধানের তুলনায় দ্রুত নগদ অর্থ, বাজারে সবজির চাহিদা ও কৃষি বিভাগের সহায়তায় রুহিয়া অঞ্চলে বাড়ছে বাণিজ্যিক সবজি চাষ; কৃষকের দাবি, কোল্ড স্টোরেজ ও সহজ কৃষিঋণ নিশ্চিত হলে সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
লাভের আশায় রুহিয়ার কৃষকেরা এখন সবজির মাঠে
- আপডেট সময় : ০৮:২০:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে

ধান ও অন্যান্য সনাতনী ফসলের বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন খরচ এবং দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার বিপরীতে দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়ার আশায় সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া অঞ্চলের কৃষকেরা। কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা, বাজারে বছরজুড়ে সবজির চাহিদা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রণোদনা—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক সবজি চাষের পরিধি বাড়ছে।
সরেজমিনে রুহিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে লাউ, বেগুন, পটল, করলা, শিম, টমেটো, ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করা হয়েছে। অনেক জমিতে একক ফসলের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে বা সমন্বিতভাবে বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছেন কৃষকেরা। ফলে একই জমি থেকে বছরে একাধিকবার আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ধানসহ দানাদার ফসল উৎপাদনে দীর্ঘ সময় জমি ব্যস্ত থাকলেও সবজি চাষে তুলনামূলক দ্রুত ফসল বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়। বিশেষ করে আগাম জাতের সবজি বাজারে তুলতে পারলে মৌসুমের শুরুতে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়।
সফল কৃষক আহসাদুজ্জামান বলেন, আগে ধান চাষ করে অনেক সময় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হতো। গত দুই বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ শুরু করার পর তিনি লাভের মুখ দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, আগাম জাতের সবজি বাজারে তুলতে পারলে সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া যায়।
এ বছর প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের সবজি চাষ করেছেন আহসাদুজ্জামান। তাঁর হিসাবে, এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আরও এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হতে পারে। আবহাওয়া ও বাজার অনুকূলে থাকলে সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি।
রাজাগাঁও ইউনিয়নের খড়িবাড়ি টাওয়ার মার্কেট এলাকার কৃষক আহসান হাবিব মাস্টার এবার ১০০ শতক জমিতে করলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, এ পর্যন্ত তাঁর প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হচ্ছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কয়েক গুণ লাভের আশা করছেন তিনি।
কৃষক মোকসেদুর আলম, ভোলানাথ মাস্টার, গুলজার ও নাসিরুল ইসলাম জানান, সবজি চাষে ধানের তুলনায় পরিচর্যা ও শ্রম কিছুটা বেশি প্রয়োজন হলেও দ্রুত ফসল বিক্রি করা যায়। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ, সার প্রয়োগ ও সময়মতো বাজারজাত করতে পারলে লোকসানের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা।
তাঁদের মতে, সবজি চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—একটি ফসল বিক্রির পর একই জমিতে আবারও স্বল্পমেয়াদি সবজি আবাদ করা যায়। এতে জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের হাতে ঘন ঘন নগদ অর্থ আসে।
রুহিয়া ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারেও যাচ্ছে। ভোর থেকেই স্থানীয় আড়ত ও বাজারগুলোতে কৃষক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের জমি থেকে সবজি কিনে ট্রাকযোগে বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
কৃষকেরা বলছেন, জমি থেকে সরাসরি সবজি বিক্রি করতে পারায় পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনার কিছু ঝামেলা কমেছে। এতে উৎপাদনকারী ও পাইকার—দুই পক্ষের মধ্যেই দ্রুত লেনদেনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও জেলায় সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনা আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জেলার শীতকালীন সবজির বড় আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর কথাও সেখানে বলা হয়।
কৃষকদের সবজি চাষে উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ থেকে মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রুহিয়া অঞ্চলের কৃষকদের জন্য প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সবজির বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। ২৫ আগস্ট ২০২৬-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রুহিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের ৮৪০ জন কৃষক-কৃষাণীর মধ্যে বিভিন্ন শাক-সবজির বীজ এবং এমওপি ও ডিএপি সার বিতরণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মো. নাসিরুল আলম বর্তমানে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কৃষি কর্মকর্তা নাসিরুল আলম জানান, সদর, রুহিয়া ও ভুল্লি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে সবজি আবাদ হচ্ছে। কম সময়ে তুলনামূলক ভালো আয় পাওয়ার সুযোগ থাকায় কৃষকেরা দিন দিন সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় তথ্যেও বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদন প্রযুক্তি, চাষপদ্ধতি ও কৃষকদের জন্য কারিগরি নির্দেশনার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে সবজি চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যাও সামনে আসছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, রুহিয়া এলাকায় একটি আধুনিক সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা গেলে দ্রুত পচনশীল সবজি সংরক্ষণ করে কৃষকেরা সুবিধাজনক সময়ে বাজারজাত করতে পারতেন। এতে মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমতে পারে।
একই সঙ্গে সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নতমানের বীজ, সেচ সুবিধা এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, পরিবহন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে রুহিয়া অঞ্চলের সবজি চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, স্থানীয় শ্রমবাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের সবজি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।














