গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় সংরক্ষিত বাড়ির ছাদে পানি জমার ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন; পুলিশের দাবি, বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে গিয়ে ভুল করে পানির সুইচ চালু হয়।
চার খুনের তদন্তে নতুন মোড়: ক্রাইম সিনে পানি নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০২:২৯:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় ‘ক্রাইম সিন’ হিসেবে সংরক্ষিত বাড়ির ছাদে রাতের আঁধারে পানি জমিয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে বাড়িটির ছাদের পানির ট্যাংক উপচে পানি নিচে পড়তে শুরু করলে স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত থাকতে পারে এমন ছাদে ইচ্ছাকৃতভাবে পানি দেওয়া হয়েছে। তবে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল হালিমের দাবি, বৈদ্যুতিক বাতির সুইচ চালু করতে গিয়ে ভুল করে পানির লাইনের সুইচ অন হয়ে যায়। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি পানির লাইন বন্ধ করে দেন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রাত ১১টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী, ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান এবং বাড়িটি পরিদর্শন করেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল হালিম বলেন, তিনি ক্রাইম সিন বাড়ির ভেতরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানোর জন্য ঢুকেছিলেন। কিন্তু ভুল করে পানির লাইনের সুইচ অন করে দেন। এতে ছাদের পানির ট্যাংক পূর্ণ হয়ে পানি উপচে ছাদে জমে যায় এবং পরে নিচে গড়িয়ে পড়ে।
তবে ক্রাইম সিনে প্রবেশের আগে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েছিলেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাড়িটির বৈদ্যুতিক বাতির সুইচবোর্ড ও পানির লাইনের সুইচবোর্ড আলাদা স্থানে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাড়িটির ভেতর, বাইরে ও ছাদে নিরাপত্তার জন্য বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। বুধবার রাতের দিকে হঠাৎ বাতি বন্ধ হওয়ার পরপরই ছাদে পানি জমতে দেখা যায়।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের স্বজন ও স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, হত্যাকাণ্ডের পরও ছাদটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্রাইম সিন’ হিসেবে বিবেচিত ছিল। সেখানে হাতের ছাপসহ বিভিন্ন ফরেনসিক আলামত থাকতে পারে। পানি দিয়ে ছাদ ভিজিয়ে দেওয়ায় এসব আলামত ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বড় ভাই পার্থ দাস অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে এবং ক্রাইম সিনের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তারের পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা বা কথা বলার সুযোগ পাননি।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসও প্রশ্ন তুলেছেন, সন্ধ্যায় বাড়িটিতে বাতি জ্বললেও হঠাৎ সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কেন ছাদে পানি জমল।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো ফরেনসিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে পানি দেওয়ার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃতভাবে আলামত নষ্টের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ক্রাইম সিনের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তা বৈদ্যুতিক বাতির সুইচ চালু করতে গিয়ে ভুল করে পানির লাইনের সুইচ চালু করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত নয়।
তিনি বলেন, ক্রাইম সিন থেকে যেসব আলামত সংগ্রহ করার প্রয়োজন ছিল, সেগুলো ইতোমধ্যে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পানি পড়লেও এতে তদন্তের আলামত নষ্ট হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছাদের পানি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেনি এবং পরে ছাদ শুকিয়ে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলীও জানান, মামলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া ক্রাইম সিনে প্রবেশের সুযোগ নেই। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।
এদিকে চার খুনের মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত তদন্ত শেষ করার লক্ষ্যেই তদন্তভার পরিবর্তন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী দায়িত্ব পেয়েছেন।
এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও দুই তরুণের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আরও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। ২৫ আগস্ট রাতে গ্রেপ্তার দুজনের বন্ধু সীমান্ত চন্দ্র দাসও আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। পরে তদন্তে মাদক সেবনের পাশাপাশি পূর্বের ক্ষোভ, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং জমি-সংক্রান্ত বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বলে আজ, ২৭ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার কথা জানিয়েছিল।
এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই হবে। একই সঙ্গে ক্রাইম সিনে পানি দেওয়ার ঘটনাটি কেন ঘটল, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে সম্ভাব্য ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্রাইম সিনে অননুমোদিত প্রবেশ, পানি ব্যবহার বা অন্য কোনো পরিবর্তন ঘটলে তার কারণ, সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্ব এবং আলামতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তদন্ত নথিতে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
রংপুরের বহুল আলোচিত এই চার খুনের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন—ক্রাইম সিনে পানি পড়ার ঘটনাটি নিছক ভুল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল। তদন্তের মাধ্যমে এর সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা।














