চিনি বিভাগে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান হলেও ডিস্টিলারি ও অন্যান্য পাঁচ বিভাগের মুনাফায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির নিট আয় দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
চিনিতে লোকসানের ধাক্কা, ডিস্টিলারির আয়ে কেরুর রেকর্ড
- আপডেট সময় : ১০:৫৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

চিনি উৎপাদন বিভাগে বড় অঙ্কের লোকসান অব্যাহত থাকলেও অন্যান্য বিভাগে মুনাফার ওপর ভর করে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার রাষ্ট্রায়ত্ত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। একই সময়ে চিনি বিভাগে সম্ভাব্য লোকসান হয়েছে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক মুনাফার প্রধান উৎস ডিস্টিলারি বিভাগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বিভাগ থেকে মুনাফা হয়েছে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। চিনি বিভাগের লোকসানসহ অন্যান্য ব্যয় সমন্বয়ের পরও কেরু অ্যান্ড কোম্পানির নিট মুনাফা ১৬৫ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে।
প্রকাশিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, কেরুর ছয়টি বিভাগের মধ্যে পাঁচটি বিভাগ মুনাফা করেছে। ডিস্টিলারি বিভাগের পাশাপাশি নয়টি বাণিজ্যিক খামার, আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামার, আকন্দবাড়িয়া বায়োফার্টিলাইজার বা জৈব সার কারখানা এবং ডিস্টিলারি ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগও মুনাফা করেছে।
এর মধ্যে নয়টি বাণিজ্যিক খামার থেকে ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামার থেকে ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা, আকন্দবাড়িয়া বায়োফার্টিলাইজার কারখানা থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং ডিস্টিলারি ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগ থেকে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা মুনাফা এসেছে।
সবগুলো মুনাফা ও চিনি বিভাগের লোকসান সমন্বয় করলে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা দাঁড়ায়। এই হিসাবটি প্রকাশিত বিভাগভিত্তিক অঙ্কের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। ওই বছর চিনি বিভাগে লোকসান হয়েছিল প্রায় ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ডিস্টিলারি বিভাগে মুনাফা ছিল প্রায় ১৯০ কোটি ২৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।
সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই সময়ে চিনি বিভাগের লোকসানও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেরুর নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১১২ কোটি ৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা। অর্থাৎ গত দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
কেরুর রেকর্ড মুনাফার সবচেয়ে বড় অবদান ডিস্টিলারি বিভাগের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বিভাগে ফরেন লিকার উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৮৬২ কেস এবং বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কেস।
একই সময়ে বোতলজাত বাংলা মদ উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮১০ কেস এবং বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮ কেস। এ বিভাগ থেকেই মোট ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা মুনাফা এসেছে।
কেরুর সামগ্রিক মুনাফা রেকর্ড হলেও চিনি উৎপাদন বিভাগ এখনও বড় ধরনের লোকসানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিনি বিভাগে লোকসান হয়েছে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে চিনি বিভাগে লোকসান ছিল প্রায় ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে চিনি উৎপাদনের লোকসান কিছুটা কমেছে। তবে এখনও লোকসানের পরিমাণ ৬০ কোটি টাকার বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ব্যয়, আখের মান, আখের সরবরাহ এবং চিনি আহরণের হারসহ বিভিন্ন বিষয় চিনিকলের উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। আধুনিকায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে চিনি বিভাগে লোকসান আরও কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কেরুজের আওতায় ৫ হাজার ৫৬২ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়। এর মধ্যে কৃষকের জমি ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ একর এবং কেরুর নিজস্ব জমি ছিল ১ হাজার ৬২৫ একর।
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৬৯ মাড়াই দিবসে ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই এবং ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। দৈনিক গড় আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন এবং চিনি আহরণের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
কিন্তু পুরোনো চিনিকলে মাড়াই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় নির্ধারিত ৬৯ দিনের পরিবর্তে মৌসুমে মাড়াই চলে মাত্র ৫৯ দিন। এ সময়ে আখ মাড়াই হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১০ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন কম আখ মাড়াই হয়েছে। এ সময়ে চিনি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৫০ মেট্রিক টন কম।
মৌসুমে চিনি আহরণের হার ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। দৈনিক গড় আখ মাড়াই হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪২ মেট্রিক টন, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন।
মুনাফার পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সরকারি রাজস্ব খাতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা ভ্যাট ও আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিনি বিভাগে বড় অঙ্কের লোকসান থাকা সত্ত্বেও ডিস্টিলারি, কৃষি খামার, জৈব সার ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগের মুনাফার কারণে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সামগ্রিকভাবে লাভজনক অবস্থানে রয়েছে।
প্রায় নয় দশক ধরে দর্শনায় কার্যক্রম পরিচালনা করা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বর্তমানে চিনি, ডিস্টিলারি, কৃষি খামার, জৈব সার ও ফার্মাসিউটিক্যালসহ একাধিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে একটি শিল্প কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি ওয়েবসাইটে বার্ষিক হিসাব বিবরণীসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করা হয়।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফলাফল কেরু অ্যান্ড কোম্পানির জন্য একদিকে রেকর্ড মুনাফার, অন্যদিকে চিনি বিভাগের দীর্ঘদিনের লোকসান কমানোর চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরেছে। ডিস্টিলারি ও অন্যান্য লাভজনক বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ালেও চিনি বিভাগকে লাভজনক করতে আধুনিকায়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আখের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়াই এখন বড় বিষয়।














