যমুনা নদীর ভাঙনে ঝুঁকিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা; স্থায়ী বাঁধ ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি স্থানীয়দের
দৌলতপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে রয়ে গেছে ভাঙন, দুর্ভোগ ও অবকাঠামো সংকট
- আপডেট সময় : ০৪:০৩:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬ ৬১ বার পড়া হয়েছে

ক্ষমতার পালাবদল ও উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম যমুনা চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। উপজেলার বাঘুটিয়া, চরকাটারিয়া ও বাচামারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের পর বছর যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার হয়ে আসছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ফলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে এখনো ব্যয়বহুল ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য মোটরসাইকেল ছাড়া কার্যত অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ভেঙে পড়ায় যাতায়াত আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় (ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়), একটি দাখিল মাদ্রাসা (চরকালিকাপুর সপুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা), একটি আলিম মাদ্রাসা (বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসা) এবং ৬৪ নম্বর চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে চরকালিকাপুর সপুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের কাজ চলছে।
বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর যমুনার ভাঙনে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতভিটা ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ছে। স্থায়ী নদীশাসনের উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পারুরিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মুক্তার হোসেন বলেন, যমুনার ভাঙনে বহুবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। বর্তমানে তাদের অবশিষ্ট বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী খন্দকার এনামুস সালেহীন জানান, বাচামারা এলাকায় প্রায় ২ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও চরাঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘুটিয়া এলাকার তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে শুভুদ্ধি, কল্যাণপুর ও পাচুরিয়া (বাসাইল) এলাকায় সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেরুবা পান্না বলেন, দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রয়েছে। জনবল সংকট থাকলেও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জিন্নাহ কবীর বলেন, সরকার ইতোমধ্যে যমুনা ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জিওব্যাগের মাধ্যমে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এছাড়া চরাঞ্চলে নতুন সড়ক নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান জানান, চরকালিকাপুর সপুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন ২০০ মিটার এলাকায় জিওব্যাগ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, স্থায়ী নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ সড়ক, সেতু-কালভার্ট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন নিশ্চিত করা হলে দীর্ঘদিনের অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব হবে।














