মুক্তিযুদ্ধে নারীর সাহসিকতা ও ত্যাগের অনন্য প্রতীক তারামন বিবি
বীর প্রতীক তারামন বিবির মৃত্যুবার্ষিকী: মুক্তিযুদ্ধে নারীর সাহসের এক উজ্জ্বল প্রতীক
- আপডেট সময় : ০৮:০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫ ৮৪ বার পড়া হয়েছে

আদিতমারী উপজেলা প্রতিনিধি:
১ ডিসেম্বর বীর প্রতীক তারামন বিবির মৃত্যুবার্ষিকী। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নারীর ভূমিকার কথা উঠলে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় এই অসীম সাহসী নারীর নাম। অনাড়ম্বর জীবন, অবিশ্বাস্য সাহস এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেম—এই তিনের অনন্য সমন্বয় ছিল তারামন বিবি। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা; অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, জীবন বাজি রেখে নদীপথ ও স্থলপথে তথ্য আদান-প্রদান করে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৫৪ সালের ১১ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলার চর শঙ্কর মাধবপুর গ্রামে জন্ম তারামন বিবির। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই কিশোরী কখনো ভাবতে পারেননি তিনি একদিন দেশের ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হবেন। তবে তার কঠোর পরিশ্রম, মানবিকতা ও দেশপ্রেম তাকে অনন্য পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলে তার বয়স ছিল মাত্র ১৫-১৬ বছর। প্রথমদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না ও সেবা দেওয়ার কাজ করলেও তার সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নজরে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের। স্থানীয় কমান্ডার আব্দুল হালিম তাকে প্রশিক্ষণসহ অপারেশনাল কাজে যুক্ত করেন। গুপ্তচরবৃত্তি, অস্ত্র পরিবহন এবং পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ—সব ক্ষেত্রেই অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন তিনি।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন বীর প্রতীক তারামন বিবি। ১৯৭৩ সালে তাকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হলেও তিনি বিষয়টি জানতে পারেন ১৯৯৫ সালে। গবেষক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মাজেদ খান তার খোঁজ পান এবং এরপর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মান জানানো শুরু হয়।
তারামন বিবির স্বামী ছিলেন আব্দুল মাজেদ। এক ছেলে আবু তাহের এবং এক মেয়ে মাজেদাকে নিয়ে তিনি কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরেই সরল জীবনযাপন করতেন। বিলাসবহুল জীবন নয়, বরং মানুষের কষ্ট, নদীভাঙন ও দারিদ্র্য—এসব বিষয়েই তার ভাবনা ছিল বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর ভোরে ৬৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বীর প্রতীক তারামন বিবি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।
তার ছেলে আবু তাহের জানান, “মা বেঁচে থাকতে অনেকেই খোঁজখবর নিতেন, এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। তবে মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা দোয়া মাহফিল ও কবর জিয়ারতের আয়োজন করেছি। মা ছিলেন খুবই সহজ-সরল। মায়ের জন্য আমরা গর্বিত।”
রাজিবপুরবাসী জানান, “মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায়ে তারামন বিবি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার ত্যাগ, সাহস আর দেশপ্রেম চিরদিনের গর্ব হয়ে থাকবে।”
বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়ন, সাহসিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তারামন বিবি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তিনি প্রমাণ করেছেন—গ্রামীণ সাধারণ এক নারীও ইতিহাস বদলে দিতে পারেন, ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কত মূল্যবান তা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বারবার।





















