নেত্রকোনায় প্রকৃতিতে কড়া নাড়ছে শীত। হেমন্তের শেষে শীতের আগমনে বদলে যাচ্ছে জনপদের চেনা দৃশ্য। ভোর ও সন্ধ্যায় ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে চারপাশ। এই শীতের শুরুতেই আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার সংস্কৃতি। শীত আর পিঠার চিরায়ত বন্ধনে মজে উঠেছেন পিঠাপ্রেমীরা।
অগ্রহায়ণের শেষভাগে সন্ধ্যা নামলেই জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, রেলস্টেশন, রাস্তার মোড় ও জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী চুলার পাশে তৈরি হচ্ছে ভাঁপা ও চিতই পিঠা। গরম পিঠার ধোঁয়া আর মিষ্টি গন্ধে মুখর হয়ে উঠছে চারপাশ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের ভিড়ে জমে উঠছে পিঠার দোকান।
সরেজমিনে জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, গোধূলি বেলায় হালকা কুয়াশা নামতেই পিঠা বানানোর তোড়জোড় শুরু করেন মৌসুমি বিক্রেতারা। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে লাইনে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন গরম গরম পিঠা। অনেকেই আবার পরিবারের জন্য পিঠা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। বিক্রেতারা জানান, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় পিঠার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
পৌর শহরের রেলক্রসিং এলাকার পিঠা বিক্রেতা মরিয়ম বেগম জানান, বৃদ্ধ মা, অসুস্থ স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসারের হাল ধরতে পিঠা বিক্রিই এখন তার একমাত্র অবলম্বন। তিনি বলেন, “চিতই পিঠার সঙ্গে ধনেপাতা ও শুঁটকি ভর্তা দেওয়া হয়। নারকেল ও গুড়ের ভাঁপা পিঠাও বানাই। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ পিস পিঠা বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা লাভ থাকে।”
বারহট্টা উপজেলার পিঠা বিক্রেতা সালমা আক্তার, মোহনগঞ্জের মজিবুর রহমান, কলমাকান্দার সুজন মন্ডল ও মদনের জামাল মিয়া জানান, শীত মৌসুমেই পিঠার বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। তবে চাল, গুড় ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ নেই। তবুও প্রতিদিন দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকার পিঠা বিক্রি করে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ থাকে।
পিঠা কিনতে আসা জেলা সদরের উকিলপাড়ার শিপন ও বারহাট্টা এলাকার সুমন বলেন, “একসময় শীত এলে বাড়িতেই নানা রকম পিঠা বানানো হতো। এখন সময়ের অভাবে বাইরে থেকেই পিঠা কিনে খেতে হয়। তবুও শীতের পিঠার স্বাদ এখনো আলাদা।”
মোহনগঞ্জ এলাকার পিঠাপ্রেমী আমেনা খাতুন জানান, “ঝামেলা ছাড়াই স্বল্প দামে গরম পিঠা পাওয়া যায় বলেই প্রায়ই কিনে খাই।”
দৈনিক ইত্তেফাকের নেত্রকোনা প্রতিনিধি শ্যামলেন্দু পাল বলেন, “ভাঁপা ও চিতই পিঠা গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য বহন করছে। একই সঙ্গে মৌসুমি এই ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।”