বান্দরবান প্রতিনিধিঃ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল—বান্দরবান, লামা, আলীকদম, চকরিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি এখন তামাক চাষের ভয়াবহ আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। কৃষি, পরিবেশ, বন, নদী ও মানুষের স্বাস্থ্য—সবই এই বিষাক্ত ফসলের শিকার।

মাটির মৃত্যু ও বন উজাড়ের দুঃখগাথা

তামাক চাষের জন্য পাহাড়ি বন ও উর্বর জমি উজাড় হচ্ছে। তামাক শুকানোর চুল্লি তৈরিতে কাঠ কাটায় ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ। এর ফলে মাটি হারাচ্ছে উর্বরতা, নদীর পানি হচ্ছে দূষিত, কৃষক হারাচ্ছেন ফসলের উৎপাদনশীলতা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান—“তামাক চাষে প্রথমে কিছু লাভ হলেও এখন জমি একেবারে মরে গেছে। অন্য কোনো ফসল ফলানো যাচ্ছে না।”

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত বিপর্যয়

তামাকের রাসায়নিক পদার্থ, কীটনাশক ও বার্নের ধোঁয়া শুধু পরিবেশ নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ভয়াবহ।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. শাহিদা রহমান বলেন, “তামাকের ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থ শিশুদের শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও চোখের সমস্যার কারণ হচ্ছে।”

গবেষণায় ভয়াবহ পরিসংখ্যান

খুলনা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী—

জমির উর্বরতা কমেছে প্রায় ৬০%

প্রতি বছর উজাড় হচ্ছে ২০,০০০ টন কাঠ

৫০% শিশু ভুগছে স্বাস্থ্যগত জটিলতায়

তামাক কোম্পানির প্রলোভনে কৃষকরা লাভের আশায় এই চাষে যুক্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা পড়ছেন ঋণ ও আর্থিক ক্ষতির জালে।

নদী ও জলজ জীবনে বিপর্যয়

মাতামুহুরী, সাঙ্গু ও বাঘখালি নদীতে তামাক চাষের রাসায়নিক বর্জ্য মিশে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয় জেলে মো. জমিরউদ্দীন জানান, “আগে নদীতে মাছ ধরতাম, এখন নদীজুড়ে শুধু মরা মাছ ভেসে থাকে।”

বিকল্প ফসলের পরামর্শ

কৃষি গবেষক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “তামাকের বিকল্প হিসেবে আদা, হলুদ, কফি, মরিচ বা অন্যান্য সবজি চাষে কৃষকরা বেশি লাভবান হতে পারেন এবং মাটিও টিকে থাকবে।”

সরকারি উদ্যোগ ও করণীয়

স্থানীয় প্রশাসন জানায়, তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে প্রচারণা চলছে। সরকারও নিচ্ছে কিছু পদক্ষেপ—

1. তামাক চাষ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ

2. বিকল্প ফসলের জন্য প্রণোদনা

3. তামাক কোম্পানির প্রলোভন বন্ধ

4. নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ না করলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ উভয়ই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
আজই প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ, নচেৎ হারিয়ে যাবে এ অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারা।