নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদামাটির স্রোতে প্রাণহানি ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে সম্মিলিতভাবে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ হাজার ৪৮ জনের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ে। বিপুল বরফ, পাথর ও মাটি নিচের উপত্যকায় নেমে এসে নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নেপালের রাসুওয়া ও নুওয়াকোটসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়। তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে হিমবাহ ধসকেই এই আকস্মিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নেপালের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৭৮১-এ পৌঁছেছিল এবং ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ ছিলেন। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর এবং ৫৪৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। দুই অঞ্চলের হিসাব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৭৯৭ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৮-এর বেশি।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষ ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে। নেপালেও শত শত বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন।
বন্যায় নেপালের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অভিযান চালাচ্ছেন। Reuters-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বন্ধ হয়ে যাওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে আটকে থাকা শত শত মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ভারী বৃষ্টি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধার তৎপরতা সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে।
এই দুর্যোগের পর নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেপালি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী উচ্চ পার্বত্য এলাকায় পর্যাপ্ত আবহাওয়া ও হিমবাহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য পায়নি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও সীমিত ছিল।
তবে চীন নেপালের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রযুক্তিগত ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় তথ্য নেপালকে সময়মতো দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের পর নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় পানিতে ও কাদায় থাকার কারণে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালে মরদেহ সংরক্ষণ, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরিচয় শনাক্তে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় অজ্ঞাত মরদেহের গণদাফনও শুরু হয়েছে।
উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে ভারী যন্ত্রপাতি, ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন কোনো হিমবাহ হ্রদ বা ভূমিধস থেকে দ্বিতীয় দফায় বন্যা তৈরি হয় কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং দ্রুত বরফ গলনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে কি না, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করছেন। ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে উন্নত হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।