খুলনা নগরীর নিরালা এলাকায় এক নারীর বাসায় মুকুল নামে এক ব্যক্তিকে আপত্তিকর অবস্থায় আটকের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পরে আবু হোসেন নামে এক ব্যক্তি স্থানীয়দের কাছ থেকে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়ার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর, মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার পর আহত সাংবাদিক শেখ তৈয়ব আলী পর্বতকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে খুলনা সদর থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ৩০ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে এ ঘটনায় থানায় মামলা/অভিযোগ দায়ের করা হয়।

ঘটনাটি খুলনা নগরীর নিরালা এলাকার ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের পাশের একটি গলিতে ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। অন্য একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল হিসেবে নিরালা তালুকদার কমিউনিটি সেন্টারের পেছনের ডাক্তার বাড়ি গলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট দুপুরে মুকুল নামে ওই ব্যক্তি আজবা নামের এক নারীর বাসায় প্রবেশ করেন। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা ওই বাসায় যান। সেখানে একটি কক্ষে মুকুল ও ওই নারীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।

স্থানীয়দের আরও দাবি, ওই সময় নারীর ছেলে মহশিন পাশের একটি কক্ষে হেডফোন কানে অবস্থান করছিলেন।

তবে এসব বক্তব্য স্থানীয়দের দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া গেছে। ঘটনার এই অংশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নারী ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

ঘটনার খবর পেয়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ঘটনাস্থলে গিয়ে মুকুলের পরিচয় জানতে চান। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি প্রথমে নিজেকে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। পরে নিজেকে বাগেরহাট জেলা আদালতের নাজির ও পেশকার বলেও দাবি করেন।

তবে তার আদালতের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। বাগেরহাট জেলা বিচার বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মচারী তালিকায় ‘মিজানুর রহমান মুকুল’ নামে একজনকে সেরেস্তাদার হিসেবে এবং সিভিল জজ আদালত, কচুয়া-র সঙ্গে সংযুক্ত দেখানো হয়েছে। সরকারি তালিকাটি বর্তমানে অনলাইনে প্রকাশিত রয়েছে।

এ কারণে মুকুলের কথিত ‘নাজির’ বা ‘পেশকার’ পরিচয়ের সঙ্গে সরকারি তালিকায় থাকা পদবির পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সরকারি তালিকায় থাকা ব্যক্তিই ঘটনাস্থলের মুকুল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

মুকুল নিজেকে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে হেদায়েত লিটন হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, পেশাগত কারণে অনেকের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে। তবে মুকুল তার ভাই নন এবং তার সঙ্গে মুকুলের কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নেই বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুকুল দাবি করেন, আদালতের একটি মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি ওই নারীর বাসায় গিয়েছিলেন। ওই নারী তার চাচাতো বোন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে ওই নারীর এক আপন ফুফাতো ভাই গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, মুকুল তার কোনো ভাই নন। মুকুল কেন এমন পরিচয় দিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান।

স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মুকুল আবু হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ফোন করেন। পরে আবু হোসেন ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে মুকুলকে সেখান থেকে নিয়ে যান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবু হোসেন নিজেকে মরহুম লিটু সাহেবের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। মুকুলকে কেন ওই পরিচয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার আদালতের পদবি ও পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে আবু হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

হামলার ঘটনায় জাতীয় দৈনিক মুখপাত্রের ক্যামেরাপারসন, দৈনিক খুলনার খবরের স্টাফ রিপোর্টার ও চিটাগাং টাইমসের খুলনা জেলা প্রতিনিধি শেখ তৈয়ব আলী পর্বত আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একই ঘটনায় ঢাকা টুডে ও চ্যানেল কর্ণফুলীর খুলনা জেলা প্রতিনিধি ফাহিম ইসলামও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার সময় শেখ তৈয়ব আলী পর্বতের হাতে থাকা মোবাইল ফোনে থাবা দিয়ে সেটি ফেলে দেওয়া হয় এবং তার ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ঘটনার ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিক ফাহিম ইসলামের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তার বুক পকেটে থাকা ৫ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় আবু হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের গালিগালাজ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। সাংবাদিকরা কীভাবে খুলনা শহরে সাংবাদিকতা করেন, তা ‘দেখে নেওয়া’র পাশাপাশি অস্ত্র ও গুলি সংক্রান্ত হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।

হামলার পর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আহত সাংবাদিক শেখ তৈয়ব আলী পর্বতকে উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর খুলনা সদর থানা ও নিরালা পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি অবহিত করা হয় বলে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।”

ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুকুলের কথিত আদালতের পদবি ও পরিচয়, ওই নারীর বাসায় তার যাওয়ার কারণ এবং পরে আবু হোসেনের মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া, টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং প্রাণনাশের হুমকির বিষয়েও তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও স্থানীয়রা।

ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, মুকুলের আদালতের সঠিক পদবি কী এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।