মণিরামপুর, যশোর | ২৯ আগস্ট ২০২৬ঃ যশোরের মণিরামপুরে এক গৃহবধূকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভাসুরের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া ভাসুর শুভ দাসের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী রচনা দাস (২২)।
আইনের সহায়তা ও ন্যায়বিচার চেয়ে গত ২৬ আগস্ট মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রচনা। মণিরামপুর থানার ওসি মো. আবু সাঈদ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তীতে জানানো হবে।
রচনা দাস মণিরামপুর পৌরসভার মহাদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি এক সন্তানের জননী। তার বাবার বাড়ি হোগলাডাঙ্গা এলাকায়। রচনার দাবি, তার বাবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের পর দুই পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সুজিত দাসকে বিয়ে করেন রচনা। শুরুতে রচনার পরিবার বিয়েটি মেনে নিলেও কয়েক মাস পর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে সুজিতের বাবা সুরঞ্জন দাস ছেলে ও পুত্রবধূকে নিজেদের বাড়িতে তুলে নেন।
রচনার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কারণে তাকে দোষারোপ ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হতো। একপর্যায়ে শ্বশুর-শাশুড়ির পাশাপাশি ভাসুর শুভ দাসও তাকে মারধর করতেন বলে দাবি করেন তিনি। শুরুতে স্বামী প্রতিবাদ করলেও পরবর্তীতে তিনিও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে তাকে মারধর করতেন বলে অভিযোগ রচনার।
তার আরও অভিযোগ, তাকে প্রায়ই ‘গরিবের মেয়ে’ বলে কটূক্তি করা হতো এবং বাবার বাড়ি থেকে দামি জিনিসপত্র এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো। স্থানীয়ভাবে কয়েক দফা সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে দাবি তার।
২৫ আগস্টের ঘটনার অভিযোগ
রচনার অভিযোগ, গত ২৫ আগস্ট তার মনে হয় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য এর আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার ভিডিও তিনি স্মার্টফোনে ধারণ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তার শ্বশুর সুরঞ্জন দাস, শাশুড়ি, স্বামী সুজিত দাস ও ভাসুর শুভ দাস একত্র হয়ে তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লিখিত অভিযোগে রচনা দাবি করেন, একপর্যায়ে তাকে টানাহেঁচড়া করে তার পরনের পোশাক ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তার গোঙানির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ সময় তার এক বছর বয়সী সন্তানকেও মারধরের জন্য এগিয়ে আসা হয়েছিল বলে দাবি করেন রচনা। পরে অসুস্থ অবস্থায় ভ্যানে করে যাওয়ার সময়ও তাকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী এ ঘটনার বিষয়ে অবগত বলে প্রতিবেদককে জানানো হয়েছে।
রচনার মামা শুদেব দাস বলেন, রচনার বাবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনিই তার খোঁজখবর রাখেন। তার দাবি, দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় শুভ দাস আগেও তাদের হুমকি দিয়েছেন।
শুদেব দাসের অভিযোগ, রচনাকে মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না—এমন হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি রচনাকে মারতে শুভ দাস তার রাইফেলের একটি বুলেটই যথেষ্ট বলেও হুমকি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে রচনার করা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শুভ দাস। সাংবাদিকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলার সময় তিনি অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং নিজের সেনাবাহিনীর সদস্য পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “একজন বলল, আপনি সেটা বিশ্বাস করলেন! কী প্রমাণ আছে যে আমি এসব করেছি? আপনার চ্যানেল কী, আপনার নাম বলেন। আমি একজন সেনাবাহিনীর সদস্য। আমাদেরও মিডিয়া আছে। আপনি কোন ধরনের মিডিয়া—খোঁজ নেব।”
এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে রচনার স্বামী সুজিত দাস আত্মগোপনে রয়েছেন বলে দাবি করেছে রচনার পরিবারের সদস্যরা। সাংবাদিকদের উপস্থিতির বিষয়টি জানার পর পুনরায় সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
তাদের আরও দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু সাঈদ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তীতে আপনাদের জানাব।”
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তী তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের ওপরই এখন বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে।
নোট: অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তাধীন। আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।