প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নকাজের তদারকি বা সমন্বয়ের দায়িত্ব সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন ৬৭ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাঁরা এ উদ্যোগকে ‘অসাংবিধানিক ও বেআইনি’ দাবি করে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। তিনি ১২ মার্চ ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন।
৬৭ সংসদ সদস্যের আপত্তির মূল বিষয় হলো—প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের উন্নয়নকাজের তদারকি বা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সাংবিধানিক দায়িত্ব ও প্রতিনিধিত্বের কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
চিঠিতে সংবিধানের ৬৫(২), ৬৫(৩), ১২১ ও ১২৪ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, ৬৫(২) অনুচ্ছেদের অধীনে ৩০০ জন সংসদ সদস্য একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ৬৫(৩) অনুচ্ছেদের অধীনে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের সদস্যরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। ফলে সংরক্ষিত নারী আসনের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা যুক্ত নয়—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট সাধারণ আসনের উন্নয়নকাজ তদারকি বা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে একই নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্বের ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত শাসন’ বা কর্তৃত্বের জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধনের একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনে নতুন ২৬ক ধারা যুক্ত করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধানের আলোচনায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের এক বা একাধিক সাধারণ আসনে উন্নয়নকাজের দায়িত্ব দিতে পারবে এবং এ বিষয়ে স্পিকারকে অবহিত করতে হবে। তবে এ উদ্যোগ নিয়েই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-কে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের তালিকায় রাখা হয়েছে।
আপত্তিপত্রে সংসদ সদস্যরা বলেছেন, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একজন এমপি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ওই এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সাধারণ আসনের মতো সরাসরি কোনো ভৌগোলিক এলাকার ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হন না।
তাদের মতে, এই দুই ধরনের নির্বাচনী কাঠামোকে বিবেচনায় না নিয়ে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট সাধারণ আসনের উন্নয়নকাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলে জনপ্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। চিঠিতে ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনীর বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিতে ভারত, পাকিস্তান, তানজানিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, নিউজিল্যান্ড ও রুয়ান্ডার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের দাবি, এসব দেশের কোথাও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের নির্বাচনী এলাকা তদারকি বা সমন্বয়ের একই ধরনের আইনি কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি।
৬৭ এমপির চিঠির বিষয়টি জনসমক্ষে আসে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিঠি ও এর আইনি যুক্তিগুলো তুলে ধরার পর। ২৭ আগস্ট সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরুর আগে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামাল হোসেনও চিঠিটি তাঁর ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, সংরক্ষিত নারী এমপিদের সাধারণ নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নকাজের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এর আগেও জাতীয় সংসদে আলোচনা ও আপত্তি উঠেছিল। বিরোধী সংসদ সদস্যদের অভিযোগ, এ ধরনের দায়িত্ব সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে
১। ডাং মোঃ শফিকুর রহমান, সংসদ সদস্য, ঢাকা-১৫
২। মোঃ আব্দুস সাত্তার, সংসদ সদস্য, নীলফামারী-১
৩। আলফারুক আব্দুল লতিফ, সংসদ সদস্য, নীলফামারী-২
৪। ওবায়দুল্লাহ সালাফী, সংসদ সদস্য, নীলফামারী-৩
৫। আব্দুল মুনতাকিম, সংসদ সদস্য, নীলফামারী-৪
৬। মোঃ রায়হান সিরাজী, সংসদ সদস্য, রংপুর-১
৭। এ টি এম আজহারুল ইসলাম, সংসদ সদস্য, রংপুর-২
৮। মোঃ মাহবুবুর রহমান (বেলাল), সংসদ সদস্য, রংপুর-৩
প্রকাশিত নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, রংপুর-১ থেকে মো. রায়হান সিরাজী, রংপুর-২ থেকে এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং রংপুর-৩ থেকে মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল) ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হন।
৬৭ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের লিখিত আপত্তির পর সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের সাধারণ নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নকাজের তদারকি বা সমন্বয়ের প্রস্তাবটি নতুন করে সাংবিধানিক ও আইনগত আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ কীভাবে এগোয় এবং স্পিকার বা সংসদ থেকে এ বিষয়ে কী অবস্থান নেওয়া হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৯.
সেলিম চৌধুরী | ভারপ্রাপ্ত ব্যুরো চিফ, সারাদেশ ৭১
১৩. Photo Title Suggestions
১. স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ৬৭ এমপির চিঠি
২. সংসদ ভবন: সংরক্ষিত নারী এমপিদের তদারকি নিয়ে বিতর্ক
৩. স্পিকারকে ৬৭ সংসদ সদস্যের লিখিত আপত্তি
৪. জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক