দুই বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। দেশটির Foreign Workers Centralised Management System (FWCMS) গত ২১ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মী এবং জনশক্তি রপ্তানিখাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগ শুরুর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট যাত্রার তারিখ কিংবা ২৫টি এজেন্সির কার্যপরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেয়নি।

দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অতীতের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী, অনিয়ম ও কথিত সিন্ডিকেটের সমস্যা এড়িয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কম খরচের নিয়োগব্যবস্থা চালু করা। এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতেও স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক নিয়োগব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও অভিবাসন ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়।

FWCMS-এ প্রকাশিত ২৫ এজেন্সির তালিকা নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এসব এজেন্সি কীভাবে জব অর্ডার পাবে, অন্য বৈধ এজেন্সিগুলো কীভাবে যুক্ত হবে এবং নিয়োগদাতা কোন পদ্ধতিতে এজেন্সি নির্বাচন করবেন—এসব বিষয়ে আরও সরকারি নির্দেশনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জনশক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদিত আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে পর্যায়ক্রমে কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২৫টি তালিকাভুক্ত এজেন্সির অনুমোদনের আওতায় সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের অধীনে বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে আগের তুলনায় বেশি এজেন্সির অংশগ্রহণের সুযোগ হতে পারে। তবে এই কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ সরকারি নির্দেশনা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়গুলোকে প্রস্তাবিত/প্রক্রিয়াধীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

FWCMS-এর ‘Registered Recruitment Agencies’ অংশে প্রকাশিত বাংলাদেশি ২৫টি এজেন্সি হলো—

১. বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড

২. বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট

৩. জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি

৪. মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস

৫. অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল

৬. আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড

৭. আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড

৮. খান জাহান আলী ওভারসিজ

৯. মেসার্স আল-শোটুপ ওভারসিজ

১০. মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড

১১. রিফা ইন্টারন্যাশনাল

১২. ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল

১৩. এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল

১৪. আল-হায়াত ওভারসিজ

১৫. ভালুকা ওভারসিজ

১৬. ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড

১৭. চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল

১৮. কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি

১৯. গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড

২০. জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ

২১. মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল

২২. ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক

২৩. নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড

২৪. তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল

২৫. অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন।

এ ছাড়া FWCMS ৪০টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকাও প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও তখন উপস্থিত ছিলেন।

৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানও জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হবে এবং সরকার অতীতের অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও হয়রানি বন্ধ করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠাতে চায়।

তবে ২১ আগস্ট ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পরও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ধাপ ও শ্রমিক পাঠানোর নির্দিষ্ট তারিখ স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে কর্মপ্রত্যাশীদের এখনই কোনো এজেন্সিকে টাকা দেওয়া, পাসপোর্ট জমা দেওয়া বা মেডিকেল করানোর আগে সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ঘোষণার আগে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আলোচনায় ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২১-২২ জুনের সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত খোলার এবং আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানান। দুই দেশ শ্রম অভিবাসন নিয়ে যৌথভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।

এর আগে এপ্রিল ২০২৬-এ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শ্রম অভিবাসনবিষয়ক বৈঠকে উভয় পক্ষ বাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি স্বচ্ছ, নৈতিক ও নিরাপদ নিয়োগব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়।

মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন বলে বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৩১ মে নতুন বিদেশি কর্মী প্রবেশের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, অনিয়ম ও কর্মীদের শোষণের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতার কারণে নতুন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত নিয়োগদাতা ও চাকরির তথ্য যাচাই এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বর্তমানে মাসে ১,৭০০ রিঙ্গিত। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয় এবং ১ আগস্ট ২০২৫ থেকে তা সব নিয়োগকর্তার জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়েছে; বিদেশি কর্মীরাও এর আওতায় রয়েছে, তবে গৃহকর্মীরা এর ব্যতিক্রম।

তবে মালয়েশিয়ায় একজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রকৃত আয় নির্ভর করবে কাজের ধরন, নিয়োগচুক্তি, কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম এবং অন্যান্য বৈধ সুবিধার ওপর। তাই শুধু ন্যূনতম মজুরির অঙ্ক দেখে কোনো চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ না করে লিখিত নিয়োগচুক্তি যাচাই করা উচিত।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার খবরে কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে ‘সীমিত এজেন্সি ব্যবস্থা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) একটি বড় অংশ বাজারটি সব যোগ্য ও বৈধ এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে।

অতীতের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ পরিচালনার কারণে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২২-২৪ পর্যায়ে মালয়েশিয়ার অনুমোদিত বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা পরে ১০১-এ দাঁড়ায় এবং অন্য লাইসেন্সধারী এজেন্সি জব অর্ডার পেলেও নির্ধারিত এজেন্সির মাধ্যমে তা প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ফলে এবার বাজার চালুর ক্ষেত্রে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ, নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে কর্মী পাঠানো, প্রকৃত চাকরি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু হওয়ার সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কথায় টাকা দেওয়া উচিত নয়। নিয়োগদাতা, চাকরির চাহিদাপত্র, বেতন, কর্মস্থল, চুক্তির মেয়াদ, আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা যাচাই করে তারপর সরকারি প্রক্রিয়ায় এগোনো জরুরি।

সরকারি Overseas Employment Platform (OEP)-এ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স ও স্ট্যাটাস যাচাই করা যায়। বর্তমানে OEP-এর এজেন্সি তালিকায় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়/মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থাও দেখা যায়।

সব মিলিয়ে ২১ আগস্ট ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে কর্মী পাঠানো শুরু হওয়ার আগে নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো, ব্যয়, কোটা, জব অর্ডার বণ্টন এবং বিএমইটির ছাড়পত্রের নিয়ম স্পষ্ট হওয়া জরুরি। এতে একদিকে কর্মপ্রত্যাশীদের স্বল্প খরচে নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে অতীতের অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হবে।