রংপুর | ২৫ আগস্ট ২০২৬ :
রংপুর নগরীতে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অধিকতর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার লক্ষ্যে তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। তিনি জানান, মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন কুমার চ্যাটার্জি ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত নতুন তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন।

পরে সন্ধ্যায় পুরোনো ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল রংপুর নগরীর দাসপাড়ায় নিহত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা মিলন কুমার চ্যাটার্জি ঘটনাস্থলে পাওয়া তথ্য, আলামত ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা মিলন কুমার চ্যাটার্জি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র হস্তান্তর করেছেন এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য সম্পর্কে তাকে অবহিত করেছেন।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে।

পুলিশের বয়ান নিয়ে প্রতিবাদ

এদিকে চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে রংপুরে বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

সোমবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নগরীতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উদ্যোগে মশাল মিছিল বের করা হয়।

বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তারা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের দেওয়া বয়ান তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তার দাবি, ঘটনাটির পেছনে আরও গভীর রহস্য বা ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ডের সব দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুইজন গ্রেপ্তার

রংপুর নগরীর দাসপাড়া এলাকায় গত শনিবার রাতে নিজ বাসা থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে দাসপাড়া এলাকার দুই যুবক মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন ও স্থানীয়রা। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তরের পর এখন হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাপ্রবাহ, আসামিদের সম্পৃক্ততা, আলামত এবং হত্যার প্রকৃত কারণসহ সব বিষয় নতুন করে যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।