ঢাকা | ২৪ আগস্ট ২০২৬ :

রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বাংলাদেশের মানব নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি।

রোববার (২৩ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীন সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত ‘Challenges of Rohingya Repatriation: International Politics and National Priorities’ শীর্ষক সেমিনারে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ নয় বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ভার বহন করতে গিয়ে বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার অবস্থানের ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংক্রান্ত দুই হাজারের বেশি মামলা দায়ের হয়েছে বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, রাজ্যটির প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের প্রতি সংগঠনটির অবস্থান ও আচরণ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অতীতের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতা থেকে কার্যকর, ধৈর্যশীল ও কৌশলগত কূটনীতির গুরুত্ব উঠে আসে।

বর্তমান সরকারের কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে মানবিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় স্বার্থ এবং অব্যাহত কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরকারের ছয়টি কৌশলগত অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এগুলো হলো—

১. আন্তর্জাতিকীকরণ: জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীজনদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি।

২. কৌশলগত ভারসাম্য: চীন ও ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা।

৩. দ্বৈত-পর্যায়ের সম্পৃক্ততা: মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখা।

৪. নিরাপত্তা জোরদার: রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ও আশপাশের এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।

৫. প্রতিরোধ সক্ষমতা: দেশের পূর্ব সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলা।

৬. আঞ্চলিক কাঠামো: আসিয়ান ও ওআইসিকে সম্পৃক্ত করে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কার্যকর আঞ্চলিক কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখা।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনযোগ্য হিসেবে যাচাইয়ের যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটি বাস্তব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তরিক অগ্রগতির প্রতিফলন কি না, তা কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। তিনি এ ঘোষণার পেছনে আন্তর্জাতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।

বক্তব্যের সমাপনীতে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে জাতীয় স্বার্থ, মানবিক দায়িত্ব এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-সচেতনতার সমন্বয়ে সরকার এই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে।

হুমায়ুন কবির
বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা