যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়া স্থগিত রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাতিল করে দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। (২১ আগস্ট) ম্যানহাটনের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক জ্যানেট ভার্গাস এই রায় দেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারক ভার্গাস মনে করেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যে নীতির মাধ্যমে ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়া স্থগিত করেছিলেন, তা তার আইনগত এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করেছে এবং ফেডারেল অভিবাসন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিচারকের মতে, জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য ঢালাওভাবে অভিবাসী ভিসা বন্ধ করে দেওয়া প্রচলিত আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে আইনি কাঠামো রয়েছে, এই নীতি তা কার্যত অগ্রাহ্য করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত করেছিল। ওই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, রাশিয়া, ইরান, মিশর, হাইতি, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ ছিল।
তখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের যুক্তি ছিল, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভিবাসীদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তা বা জনকল্যাণমূলক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই কারণ দেখিয়ে নীতিটি কার্যকর করা হয়েছিল।
বিচারক ভার্গাসের রায়ে বলা হয়েছে, কেবল আবেদনকারীর জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসী ভিসা দেওয়া নিষিদ্ধ করা হলে তা ব্যক্তিগতভাবে আবেদন যাচাইয়ের আইনি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাও এই নীতির মাধ্যমে অতিক্রম করা হয়েছে বলে আদালত মনে করেছে।
অর্থাৎ, কোনো আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ‘public charge’ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, সেটি ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করার পরিবর্তে শুধু তার দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে ভিসা আটকে রাখা আইনসঙ্গত নয়—এটাই রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে দেখা দরকার। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জানুয়ারির নীতিতে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশে অভিবাসী ভিসা প্রসেসিং আবার শুরু হয়। ১ জুন ২০২৬ থেকে ঢাকায় সব ধরনের অভিবাসী ভিসা ক্যাটাগরির প্রসেসিং দুই কর্মদিবসের মধ্যে করার কথা জানানো হয়েছিল।
তাই নতুন আদালতের রায়ের অর্থ এই নয় যে ২২ আগস্ট থেকে বাংলাদেশিদের জন্য প্রথমবারের মতো অভিবাসী ভিসা চালু হলো। বরং আদালত ৭৫ দেশের ওপর আরোপিত সেই জাতীয়তাভিত্তিক স্থগিত নীতিকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে বাতিল করেছে। ফলে নীতিটির কারণে যেসব আবেদন আটকে ছিল বা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে আইনি প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ভিসা পাওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয় নয়; প্রতিটি আবেদনকে সংশ্লিষ্ট আইনি যোগ্যতা ও কনস্যুলার যাচাইয়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জানুয়ারির ৭৫ দেশের নীতিটি ছিল ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে। অর্থাৎ স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভিসা। এটি পর্যটন, শিক্ষার্থী বা অন্যান্য নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার সাধারণ প্রক্রিয়ার ওপর একইভাবে প্রযোজ্য ছিল না।
অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা Catholic Legal Immigration Network (CLINIC) এবং African Communities Together-সহ কয়েকটি পক্ষ এই নীতির বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভিসা আবেদনকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এমন নাগরিকরাও ছিলেন, যারা পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য আবেদন করেছিলেন।
বিচারক ভার্গাসের রায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসন চাইলে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। ফলে আদালতের রায়টি বাস্তবে কীভাবে এবং কত দ্রুত কনস্যুলার কার্যক্রমে প্রতিফলিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।