ঠাকুরগাঁও | ২২ আগস্ট ২০২৬: একসময় কাজহীনতা, অভাব আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটত জয়ন্ত সেনের। নিয়মিত কোনো আয় ছিল না, পড়াশোনাও মাধ্যমিকের পর আর এগোয়নি। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিতে কেটে যেত দিনের বড় একটি সময়। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা কখনো হারিয়ে যায়নি। সুযোগ পেয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ।
জয়ন্ত সেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের জামুরীপাড়া এলাকার বিশ্বেসর সেনের ছেলে। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজো। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের পরই তার পড়াশোনার ইতি ঘটে। এরপর কাজের সন্ধানে ঘুরলেও নিয়মিত কাজ পাননি। ফলে একসময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েই হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।
তবে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল জয়ন্তের মনে। সেই সময় ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর রেইজ প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের একটি লিফলেট তার হাতে আসে। সেখানে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। লিফলেটের মাধ্যমে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা জেনে আগ্রহী হন জয়ন্ত।
পরে তিনি ইএসডিও কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর ইএসডিও-এর রেইজ প্রকল্পের সহযোগিতায় মাস্টার ক্রাফটপার্সন মো. সাদেকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
প্রশিক্ষণে ইলেকট্রনিক বিভিন্ন যন্ত্রের ত্রুটি শনাক্ত করা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিংয়ের নানা কৌশল শেখেন জয়ন্ত। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু একটি কারিগরি দক্ষতাই অর্জন করেননি, নিজের প্রতি আস্থাও ফিরে পান তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষে ইএসডিও-এর রেইজ প্রকল্প থেকে ২১ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তির অর্থ পান জয়ন্ত। সেই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় একটি মেশিন কেনেন। এরপর অন্যের কাজের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ঠাকুরগাঁও শহরের বদিউলের মোড়ের ঘোষপাড়া এলাকায় ছোট পরিসরে শুরু করেন ‘এ আর কে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার’ নামে নিজের ব্যবসা। শুরুতে দোকানে গ্রাহক কম থাকলেও হাল ছাড়েননি তিনি। প্রশিক্ষণে অর্জিত দক্ষতা, আন্তরিকতা ও ভালো সেবা দিয়ে ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে থাকেন।
একসময় যে তরুণের হাতে নিয়মিত কাজ ছিল না, বর্তমানে সেই জয়ন্তই অন্যের নষ্ট হয়ে যাওয়া ইলেকট্রনিক যন্ত্র মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে নিজের দোকান থেকে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনেও সহায়তা করছেন।
জয়ন্ত সেন বলেন, “একসময় আমার কোনো কাজ ছিল না। কী করব, কীভাবে নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু করব—এসব নিয়ে সব সময় চিন্তা হতো। কাজ না থাকায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, ঘোরাঘুরি করেই অনেকটা সময় কেটে যেত। একদিন ইএসডিওর কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা জানতে পারি। তখন মনে হলো, সুযোগটা কাজে লাগানো উচিত।”
তিনি বলেন, “কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে মানুষ আমার কাজ সম্পর্কে জানতে শুরু করে। পরিচিতি বাড়ে এবং এখন আলহামদুলিল্লাহ, মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করতে পারছি।”
জয়ন্ত আরও বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা, এখন আর নিজেকে বেকার মনে হয় না। নিজের একটা পরিচয় তৈরি হয়েছে। নিজের হাতে কাজ আছে, আয় আছে—এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আমার ইচ্ছা ভবিষ্যতে যেন আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি।”
ইএসডিও-এর ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট অফিসার মো. সাজেদুর রহমান বলেন, জয়ন্তের মতো অনেক তরুণের মধ্যেই কাজ করার আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাব, সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে অনেকেই তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেন না।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়; প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন তরুণকে বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা এবং তার জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।”
সাজেদুর রহমান আরও বলেন, জয়ন্ত প্রশিক্ষণের সুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পর সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেই ব্যবসা শুরু করেছেন। ইএসডিও থেকে পাওয়া সহায়তাকে নিজের পরিশ্রম ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করেই জয়ন্ত একটি টেকসই আয়ের পথ তৈরি করতে পেরেছেন।
তার মতো আরও তরুণ যেন দক্ষতা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, সে লক্ষ্যেই ইএসডিও রেইজ প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অভাবের ঘরে বেড়ে ওঠা জয়ন্ত সেনের গল্প তাই শুধু একজন তরুণের আত্মকর্মসংস্থানের গল্প নয়; এটি দক্ষতা অর্জন, সুযোগের সদ্ব্যবহার ও নিজের উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।