কুড়িগ্রাম, ১৮ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার: মাটির বুক চিরে মাথা তুলছে সবুজ রোপা আমনের চারা। কাদামাটিতে পা ডুবিয়ে একের পর এক চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। শরীরজুড়ে ক্লান্তি, কপালে ঘাম—তবুও থেমে নেই তাদের কর্মব্যস্ততা। কারণ, এসব ছোট ছোট সবুজ চারার মধ্যেই তারা দেখছেন পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের পড়াশোনা ও ঘরে সোনালি ধান ওঠার প্রত্যাশা।
কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে রোপা আমন চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ভোরের আলো ফুটতেই কৃষকেরা ছুটছেন মাঠে। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ বীজতলা থেকে চারা তুলছেন, আবার কেউ কাদামাটির জমিতে সারিবদ্ধভাবে আমনের চারা রোপণ করছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়েই চলছে এই কর্মযজ্ঞ।
চরাঞ্চলের কৃষকের কাছে আমন ধান শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়; এটি পরিবারের খাদ্য, আয় ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। রাজিবপুরের কৃষিনির্ভর জনপদে ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের চিত্র দীর্ঘদিনের। উপজেলা-সংক্রান্ত তথ্যেও ধানকে এলাকার অন্যতম প্রধান কৃষি ফসল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কৃষকের এই স্বপ্নের পথে বড় বাধা বন্যা ও নদীভাঙন। নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রাম জেলার চর ও নিম্নাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে পানি বৃদ্ধি পেলে কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে কুড়িগ্রামসহ রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আমন চারা রোপণ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কৃষকেরা জানান, চারা রোপণের পর বন্যার পানি জমিতে ঢুকে পড়লে কচি ধানের চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে কয়েক দিনের শ্রম, বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতের খরচ—সবই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তারপরও ক্ষতির আশঙ্কা উপেক্ষা করে নতুন করে জমিতে নামছেন তারা।
এক কৃষক বলেন, “চারা লাগাইয়া যখন দেখি পানি আইয়া সব ডুবাইয়া দেয়, তখন খুব কষ্ট লাগে। কিন্তু চাষ না করলে সংসার চলবে কীভাবে? তাই আবার লাগাই। এবার আল্লাহর ওপর ভরসা করে চাষ করছি।”
রংপুর কৃষি অঞ্চলের চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামসহ পাঁচ জেলায় বড় পরিসরে আমন আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ টন পরিষ্কার আমন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমন চাষে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা বা বামিসের সাম্প্রতিক পরামর্শে আমন ধানের মূল জমি চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত করা এবং অনুকূল আবহাওয়ায় উপযোগী জাত নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের উচ্চ জমিতে বীজতলা তৈরি, আগাম চারা প্রস্তুত রাখা এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চরাঞ্চলে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ফসলের পরিচর্যা ও সার প্রয়োগের বিষয়েও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চর রাজিবপুরের মাঠে এখন যতদূর চোখ যায়, সবুজ চারার সারি। প্রতিটি চারার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আশা। বন্যা আসবে কি না, নদীর পানি বাড়বে কি না কিংবা নদীভাঙনে জমি থাকবে কি না—এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেও কৃষকেরা মাটিতে রোপণ করছেন নতুন স্বপ্ন।
কারণ, কৃষকের স্বপ্ন সহজে ডুবে যায় না। বন্যার পানি একবার সেই স্বপ্ন ভাসিয়ে নিলেও কৃষক আবার মাটির বুক চিরে নতুন করে বীজ বোনেন, চারা রোপণ করেন। চর রাজিবপুরের মাঠে আজ সেই সংগ্রাম, প্রত্যাশা আর নতুন জীবনের স্বপ্নই সবুজ হয়ে উঠছে।