পরীক্ষা, চাকরির সাক্ষাৎকার, আর্থিক চাপ কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার আগে দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ অনুভব করা স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই উদ্বেগ সাধারণত পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে কমে আসে। কিন্তু অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ঘুম, কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে সেটি উদ্বেগজনিত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

সাধারণ দুশ্চিন্তার পেছনে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে। যেমন—পরীক্ষার ফলাফল, চাকরির ইন্টারভিউ কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সাময়িক উৎকণ্ঠা হওয়া। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এই উদ্বেগও সাধারণত কমে যায়।

অন্যদিকে, উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভয় বা দুশ্চিন্তার মাত্রা পরিস্থিতির তুলনায় বেশি হতে পারে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক কারণ না থাকলেও খারাপ কিছু ঘটবে—এমন আশঙ্কা বারবার মনে আসতে পারে। উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠলে এবং তা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

অতিরিক্ত চিন্তা বা উদ্বেগ,দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা,অস্থিরতা বা সব সময় টেনশনে থাকা,মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা,সহজেই বিরক্ত হয়ে যাওয়া,অতিরিক্ত ক্লান্তি,ঘুমাতে সমস্যা বা ঘুমের ব্যাঘাত,পেশিতে টান বা ব্যথা,মাথাব্যথা,পেটের অস্বস্তি বা পেটব্যথা,অতিরিক্ত ঘাম,কাঁপুনি বা মাথা হালকা লাগা,শ্বাস নিতে অস্বস্তি,হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি।

উদ্বেগজনিত সমস্যার ধরনভেদে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। তবে উদ্বেগের কারণে দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, চাকরি বা সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ব্যাহত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

ধরা যাক, বিকেলে পরীক্ষা রয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পরীক্ষা নিয়ে নার্ভাস লাগছে, বুক ধড়ফড় করছে বা পেটে অস্বস্তি হচ্ছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অনুভূতি ফিরে আসে, তাহলে এটি পরিস্থিতিজনিত স্বাভাবিক উদ্বেগ হতে পারে।

কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যদি দিনের পর দিন মনে হতে থাকে যে প্রিয়জনের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটবে, আর সেই চিন্তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি উদ্বেগজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

উদ্বেগকে শুধু ‘বেশি চিন্তা করা’ বলে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। যদি উদ্বেগ বারবার ফিরে আসে, দীর্ঘস্থায়ী হয়, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় অথবা ঘুম, কাজ, পড়াশোনা ও সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

বিশেষ করে সাধারণীকৃত উদ্বেগজনিত সমস্যা (Generalized Anxiety Disorder বা GAD) নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত বেশির ভাগ দিন অতিরিক্ত উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা এবং অন্তত ছয় মাস ধরে এ ধরনের সমস্যা থাকা বিবেচনা করা হয়। তবে ব্যক্তিভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে এবং রোগ নির্ণয় বিশেষজ্ঞের কাজ।

উদ্বেগজনিত সমস্যা চিকিৎসাযোগ্য। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (CBT), এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।

নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন কমানোর মতো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস উদ্বেগের উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব অভ্যাস পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়।

তাই দীর্ঘদিনের বা তীব্র উদ্বেগ থাকলে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ শুরু না করে যোগ্য চিকিৎসক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সূত্র: National Institute of Mental Health (NIMH), Healthline