বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন ফাহমিদা আক্তার চৌধুরী ইভা। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে গবেষণার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের Central Michigan University (CMU)-তে একাডেমিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তাঁর গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশে নিজের সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি Central Michigan University-এর Student Creative and Research Endeavors Exhibition (SCREE) 2026-এ ফাহমিদা আক্তার চৌধুরী ইভা তাঁর গবেষণাকর্ম “Neutron-Activated Production of Chlorine-36 for Mass Spectrometry Applications” উপস্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দর্শক ও ভোটারদের পছন্দের ভিত্তিতে তিনি People’s Choice Award-এ প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১০০ মার্কিন ডলার।

Central Michigan University-এর তথ্য অনুযায়ী, SCREE শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও সৃজনশীল কাজ উপস্থাপনের একটি আয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের গবেষণার ফলাফল পোস্টার ও অন্যান্য উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরেন। ফাহমিদার গবেষণা প্রকল্পও এই আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিমণ্ডলে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

ফাহমিদার উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর লক্ষ্য ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের মতো জটিল ও সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্রে গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের Central Michigan University-তে পূর্ণ স্কলারশিপে মাস্টার্স করার সুযোগ পান। সেখানে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফর্মে নিজের কাজ উপস্থাপনের সুযোগ পান।

তাঁর গবেষণার সাম্প্রতিক স্বীকৃতি হিসেবে SCREE 2026-এর People’s Choice Award-এ প্রথম স্থান অর্জনের বিষয়টি Central Michigan University-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকায় তাঁর নাম, বিভাগ এবং গবেষণার শিরোনাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

ফাহমিদার সাম্প্রতিক গবেষণার শিরোনাম—“Neutron-Activated Production of Chlorine-36 for Mass Spectrometry Applications”। গবেষণার বিষয়টি নিউট্রন-অ্যাক্টিভেশন এবং Chlorine-36 উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত।

এ ধরনের গবেষণায় নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের নীতির পাশাপাশি পরিমাপ, বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে শিক্ষার্থী পর্যায়ে এমন গবেষণায় সম্পৃক্ততা ফাহমিদার গবেষণামুখী একাডেমিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ফাহমিদার গবেষণামুখী আগ্রহের একটি পুরোনো রেকর্ডও অনলাইনে পাওয়া যায়। ২০২০ সালের University Physics Competition-এর ফলাফলে University of Chittagong-এর একটি দলের সদস্য হিসেবে Mosammath Fahmida Akter Chowdhury Eva-র নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি A.K.M. Moinul Haque Meaze-এর নেতৃত্বাধীন দলের সদস্য হিসেবে অংশ নেন।

এটি থেকে অন্তত বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আগেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিযোগিতামূলক ও গবেষণামুখী কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, মাস্টার্স সফলভাবে সম্পন্ন করার পর ফাহমিদা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন এবং এর জন্য পূর্ণ অর্থায়ন বা স্কলারশিপের অফার পেয়েছেন।

এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতির সময় উন্মুক্ত অনলাইন উৎসে পিএইচডি অফারের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিমাণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই ফান্ডিংয়ের বাংলাদেশি মুদ্রায় ‘দুই কোটি টাকার বেশি’ মূল্যমান প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার বা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা সমীচীন।

তবে তাঁর গবেষণার সাম্প্রতিক স্বীকৃতি থেকে স্পষ্ট যে Central Michigan University-এর গবেষণা পরিবেশে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন এবং তাঁর গবেষণা ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গবেষণা প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হয়েছে।

ফাহমিদার এই পথচলার পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাও সামনে আসে। সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দেন এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি উৎসাহ জোগান।

পরে বিয়ের পরও তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যায়নি। বরং স্বামী ডাক্তার রোমান খাঁন তাঁর বিদেশে পড়াশোনা ও গবেষণার স্বপ্নকে সম্মান করে পাশে থেকেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এই দিকটি ফাহমিদার গল্পকে কেবল একটি একাডেমিক সাফল্যের কাহিনি না করে পরিবার, শিক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি ইতিবাচক উদাহরণে পরিণত করেছে।

ফাহমিদা আক্তার চৌধুরী ইভার পথচলা বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সামনে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতি, অধ্যবসায় এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহ থাকলে বিশ্বমানের একাডেমিক পরিবেশে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় বাংলাদেশের মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর মতো উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ে বা পারিবারিক দায়িত্ব একজন নারীর উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতেই হবে—এমন ধারণাকে তাঁর পথচলা প্রশ্নবিদ্ধ করে। একজন নারী পরিবার ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজের শিক্ষাগত ও গবেষণামূলক লক্ষ্য এগিয়ে নিতে পারেন—ফাহমিদার গল্প সেই সম্ভাবনাই সামনে আনে।

একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য তখনই বৃহত্তর অর্থ বহন করে, যখন তা অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করে। ফাহমিদার গবেষণার স্বীকৃতি এবং নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সামনে তেমনই একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়া—এই পথচলা বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

বর্তমানে ফাহমিদা আক্তার চৌধুরী ইভা তাঁর স্বামী ডাক্তার রোমান খাঁনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে তিনি আরও এগিয়ে যাবেন—এমন প্রত্যাশা তাঁর পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দেশের তরুণ প্রজন্মের।

ফাহমিদার গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন দেখার, বাধা অতিক্রম করার এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার মঞ্চে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতা তুলে ধরার গল্প।