রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির জন্য মনোনীত হলেন তিনি।
তবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়া এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১-এর তথ্য রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
অর্থাৎ রাজনীতির পাশাপাশি তার পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে উঠেছিল শিক্ষকতা পেশাকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীতে সেই শিক্ষকতা জীবন ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন।
বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ২০০৯ সালে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলটির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এই অভিজ্ঞতার কারণে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দেখা গেছে। বিরোধী দলের কঠিন সময়ে তিনি দলীয় কর্মসূচি পরিচালনা, সংবাদ সম্মেলন এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে সক্রিয় ছিলেন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ঢাকার মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একাধিক মামলায় আসামি করা হয়—যা তার রাজনৈতিক জীবনের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে মির্জা ফখরুল নিজেই জানিয়েছিলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে।
পরবর্তী সময়ে দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তার নাম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসে। ১ আগস্টের এক প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় মির্জা ফখরুলসহ তিনজনের নাম সামনে আসার কথা জানানো হয়েছিল।
অবশেষে ১৩ আগস্ট তার নাম বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে।
মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দলের মহাসচিব পদসহ তার বর্তমান রাজনৈতিক দায়িত্বগুলোতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ নিয়ে বিএনপির ভেতরে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর। তাই মনোনয়নকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সমার্থক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।