রংপুর নগরীর তাজহাট আনসারীর মোড় এলাকায় রিকশার গ্যারেজের ভেতর থেকে আব্দুর রহমান (৬৫) নামে এক গ্যারেজ মালিকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যার পর গ্যারেজের শাটার নামিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে গ্যারেজের শাটারে বাইরে থেকে তালা ঝুলতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। তারা আব্দুর রহমানকে ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাননি। পরে শাটারের একটি ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিয়ে মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এরপর স্থানীয়রা তালা ভেঙে গ্যারেজের ভেতরে প্রবেশ করে মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে তাজহাট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আব্দুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় রিকশার গ্যারেজ পরিচালনা করে আসছিলেন। গ্যারেজেই থাকতেন তিনি এবং সেখানে থাকা রিকশাগুলোর দেখাশোনা করতেন।
ঘটনাস্থলে গ্যারেজের একটি আলমারি ও ড্রয়ার ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এতে গ্যারেজে থাকা টাকা-পয়সা নিয়ে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, আব্দুর রহমানের একাধিক বিয়ে এবং পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, সর্বশেষ স্ত্রীকে কেন্দ্র করে তার সন্তানদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এমনকি একপর্যায়ে সন্তানরা তাকে স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করেছিলেন বলেও একজন প্রতিবেশী দাবি করেছেন। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গ্যারেজের পাশের সেলুন মালিক নাদিম জানান, রাতে শাটার বন্ধ হয়ে গেলে আব্দুর রহমান সাধারণত দরজা খুলতেন না। কেউ এলে ভেতর থেকেই কথা বলতেন। কিন্তু ঘটনার রাতে আশপাশের কেউ কোনো ধরনের চিৎকার বা অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পাননি।
নাদিমের ভাষ্য, ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে এবং হত্যাকাণ্ডে ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ জড়িত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটি তার ব্যক্তিগত ধারণা; পুলিশ এখনো কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
গ্যারেজসংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা হিরু মিয়া জানান, রাত ১২টার দিকে তিনি বাড়িতে ফেরেন। তখন গ্যারেজের শাটার নামানো ছিল। সকালে লোকজনের চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে এসে তিনি রক্ত দেখতে পান। পরে শাটারের ফাঁক দিয়ে আব্দুর রহমানের মরদেহ দেখতে পান।
ঘটনাস্থলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। সেখান থেকে রক্তমাখা একটি সেলাই রেঞ্চ উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও ঘটনাস্থলে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আব্দুর রহমানের মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মামলা করতে চাইলে তা গ্রহণ করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং গ্যারেজ থেকে কোনো অর্থ বা মালামাল খোয়া গেছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের পর স্পষ্ট হবে।
তদন্তের অগ্রগতির ওপরই এখন নির্ভর করছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি অর্থ বা পারিবারিক বিরোধের জেরে সংঘটিত ঘটনা—তার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন।