পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত এক গ্রামে দেখা মিলেছে মানবতার এক অনন্য দৃশ্য। যেখানে শ্রমিকের পোশাক ও পরিচয়ে নয়, বরং ভালোবাসা ও সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে নির্মাণকাজে ব্যস্ত নেদারল্যান্ডসের একদল তরুণ। কুষ্ঠ আক্রান্ত ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নির্মাণাধীন ভবনে নিজের হাতে ইট, বালু ও সিমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন তারা।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার ধাইধাইপাড়া এলাকায় আগমনী কুষ্ঠ ও প্রতিবন্ধী সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করছে নেদারল্যান্ডসের ২৯ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল। শিক্ষক, ব্যাংকার, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার এসব তরুণ কয়েক দিনের জন্য বাংলাদেশে এসে যুক্ত হয়েছেন এই মানবিক কার্যক্রমে।
কেউ বালুর সঙ্গে সিমেন্ট মিশিয়ে দিচ্ছেন, কেউ মাথায় করে বহন করছেন ইট, আবার কেউ দক্ষ রাজমিস্ত্রির মতো গাঁথছেন দেয়াল। প্রচণ্ড গরম ও রোদের মধ্যেও তাদের কাজের আগ্রহে কোনো কমতি নেই।
স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, কুষ্ঠ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের আত্মনির্ভরশীলতার পথ তৈরি করতেই তারা এই উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন।
জানা গেছে, আটোয়ারীর ধাইধাইপাড়া এলাকায় আগমনী কুষ্ঠ ও প্রতিবন্ধী সমাজ কল্যাণ সংস্থা জমি কিনে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। পরে নেদারল্যান্ডসের ওয়ার্ল্ড সার্ভেন্ট (World Servants) নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের একটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ভবন নির্মাণে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে এসেছে নেদারল্যান্ডসের স্বেচ্ছাসেবী দলটি। কয়েকদিন অবস্থানের পর তারা আবার নিজ দেশে ফিরে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বিদেশি তরুণদের এমন উদ্যোগে মুগ্ধ। তারা বলছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে বিদেশিরা যেভাবে কাজ করছেন, তা সম্প্রীতি ও মানবিকতার বড় উদাহরণ।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে কাজ করছে। তাদের আন্তরিকতা দেখে ভালো লাগছে।”
আরেকজন বলেন,
“নেদারল্যান্ডসের মতো শীতপ্রধান দেশের মানুষ এত গরমের মধ্যে এসে আটোয়ারীতে যে পরিশ্রম করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
কুষ্ঠ আক্রান্ত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এই উদ্যোগে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিদেশি স্বেচ্ছাসেবীদের এই সহযোগিতা শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়, বরং সমাজে তাদের মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে।
আটোয়ারী উপজেলা প্রশাসনও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষকে বোঝা হিসেবে নয়, তাদের সক্ষমতা ও প্রতিভাকে গুরুত্ব দিয়ে সমাজের মূলধারায় যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী মানুষদের সুযোগ দিলে তারাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন।
নেদারল্যান্ডসের তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—কুষ্ঠ আক্রান্ত ও প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।