রাঙ্গাবালী, পটুয়াখালী | ৩১ জুলাই ২০২৬:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় বনায়নের ভেতরের খালগুলোতে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার এবং বনাঞ্চলের গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে একদিকে যেমন ছোট প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে জোয়ারের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় গবাদিপশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার চর মাদারবুনিয়াসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলের ছোট ছোট খাল নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। জোয়ার-ভাটার সময় এসব খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্র খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। বাঁধ নির্মাণে বনাঞ্চলের গাছ কাটারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মৌখিক অনুমতির মাধ্যমে প্রভাবশালীদের কাছে বনাঞ্চলের খাল দখল করে মাছ শিকারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ জেলেরা মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নথি পাওয়া যায়নি।
চর মাদারবুনিয়ার বাসিন্দা মনজুর রহমান মৃধা দাবি করেন, তিনি বনে ১৯টি মহিষ পালন করেন। গত ২১ জুলাই রাতে একটি খালের বাঁধে আটকে জোয়ারের পানিতে ডুবে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের একটি মহিষ মারা যায়। একই সঙ্গে আরও তিনটি ছোট মহিষ নিখোঁজ রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জসিম মিয়া বলেন, খালে বাঁধ দেওয়ায় জোয়ারের পানি আটকে গিয়ে মহিষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বিষ প্রয়োগের কারণে ছোট মাছ মারা যাচ্ছে এবং গবাদিপশুরও ক্ষতি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
আরেক বাসিন্দা রিয়াদ হোসেন অভিযোগ করেন, বনাঞ্চলের গাছ কেটে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি ঘটনার তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী অভিযোগ করেন, বিষ প্রয়োগের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ মারা যাচ্ছে এবং সেগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালীদের মৌখিকভাবে খাল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত ওহাব মাদবর বলেন, যে বাঁধে মহিষ মারা গেছে সেটি তিনি নির্মাণ করেননি। তার দাবি, অন্য একটি খালে তিনি বাঁধ দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট বাঁধটি সুমন নামে অন্য একজন নির্মাণ করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে তারা বাগান ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে একজন ব্যক্তি দাবি করেন, বিট কর্মকর্তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মৌখিক অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। এই অডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে রাঙ্গাবালী সদর বিট কর্মকর্তা ফজলুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বন বিভাগ কাউকে বাগান বা খাল লিজ দেয়নি। তিনি জানান, মহিষ মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছেন এবং বনের মধ্যে যেসব অবৈধ বাঁধ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি গাছ কেটে বাঁধ নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।