সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে নদীতীর কাটার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিবেশ ও নদীতীরবর্তী গ্রাম রক্ষায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহালের ইজারাদাররা। নদীর নির্ধারিত সীমানার বাইরে ড্রেজার চলাচল ঠেকাতে নদীর তীরজুড়ে বাঁশের বেড়া (ব্যারিকেড) নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি টানানো হয়েছে লাল সতর্কবার্তা সম্বলিত ব্যানার।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সরকারি দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা রাজস্বের বিনিময়ে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সীমানার মধ্যে শুধুমাত্র সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে। নিষিদ্ধ ড্রেজার বা বোমা মেশিন ব্যবহারের সুযোগ নেই।

ইজারাদারদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে নদীতীর কেটে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করছে। এতে দেশের অন্যতম দর্শনীয় শিমুল বাগান, নদীতীরবর্তী গ্রাম, কৃষিজমি ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের দায় অনেক সময় বৈধ ইজারাদার ও সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করা শ্রমিকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়।

স্থানীয় বালু শ্রমিক মো. রমজান আলী, বাসু মিয়া ও মো. একলাস নূর বলেন, তারা সরকারি নিয়ম মেনে হাতে বালু উত্তোলন করেন। কিন্তু রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে নদীতীর কাটার কারণে পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি তাদের কর্মসংস্থানও সংকুচিত হচ্ছে। তারা অবৈধ ড্রেজার ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইজারাদাররা নদীর পাড়ে বাঁশের শক্তিশালী ব্যারিকেড তৈরি করছেন, যাতে কোনো ড্রেজার বা নৌযান সহজে নদীতীরের কাছে যেতে না পারে। নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ উল্লেখ করে সতর্কবার্তাও টানানো হয়েছে।

ইজারাদার প্রতিনিধি মো. লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া বলেন, সরকারি শর্ত মেনে পরিচালিত বালুমহালে হাজারো শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতের আঁধারে শিমুল বাগানসংলগ্ন নদীতীর কেটে পরিবেশের ক্ষতি করছে। তারা দাবি করেন, এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

ইজারাদার শাহ রুবেল বলেন, সরকারকে বিপুল রাজস্ব প্রদান করে বৈধভাবে মহাল পরিচালনা করা হচ্ছে। নদীর পাড়, শিমুল বাগান ও স্থানীয় জনপদ রক্ষায় নিজস্ব অর্থায়নে বাঁশের বেড়া নির্মাণ এবং পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি জানান, অবৈধভাবে নদীতীর কাটার অভিযোগে এর আগে জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় ৬৬টি মামলা হয়েছে। এতে ৩৭৫ জন এজাহারভুক্ত এবং মোট ৭২০ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬০ জনকে। তবে তিনি বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী এসব অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়ায় অনেক অভিযুক্ত দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, টাস্কফোর্স, মোবাইল কোর্ট ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইজারাদারদের নদীতীরে বাঁশের ব্যারিকেড নির্মাণের উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, যাদুকাটা নদী শুধু একটি বালুমহাল নয়, এটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ এবং শিমুল বাগানের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অবৈধভাবে নদীতীর কাটার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের অভিযান, আইন প্রয়োগ এবং ইজারাদারদের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে যাদুকাটা নদী, শিমুল বাগান ও নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব হবে।