মৌলভীবাজার | ১৮ জুলাই ২০২৬: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় মনু নদ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে চললেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর আপত্তির কারণে চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে চলতি বর্ষাসহ প্রতিবছরই বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক বাসিন্দা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মনু নদ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটির প্রায় পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা চারটি স্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ ভারতীয় বিএসএফের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে সীমান্তবর্তী এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা মনু নদ আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় সীমান্ত ও আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ কারণে ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) মাধ্যমে বিষয়টি ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
এরই মধ্যে চলতি বর্ষায় প্রকল্পের অসমাপ্ত অংশের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। গত ৮ জুলাই গভীর রাতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া এলাকায় ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে শিকড়িয়া, আলীনগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়ে। স্থানীয়রা ভাঙা বাঁধের ওপর বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে যাতায়াত করছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য তাহির আলী এবং বাসিন্দা ময়জুল মিয়া ও ইউনুস মিয়া জানান, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় পৃথিমপাশা, টিলাগাঁও, হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের হাজারো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাজাপুর, বেলরতল ও ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ ঠিকাদারের ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে পিছিয়ে গেছে। এছাড়া শিকড়িয়া, নিশিন্তপুর, তেলিবিল ও দত্তগ্রাম এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এখনো সংস্কার না হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন করে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, “প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানে বিএসএফের আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে জরুরি মেরামত ও সুরক্ষামূলক কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।”
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, “প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে জেলা উন্নয়ন সভায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।”
শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া ও দত্তগ্রাম এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার এবং মাটি ভরাটের কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারকে বিজিবি প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তসংক্রান্ত কূটনৈতিক জটিলতার দ্রুত সমাধান করে মনু নদ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা না হলে ভবিষ্যতেও বর্ষা মৌসুমে হাজারো মানুষকে বন্যা ও নদীভাঙনের দুর্ভোগ পোহাতে হবে।