ঢাকা | ১৫ জুলাই ২০২৬: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম তাঁর শেষ কর্মদিবসে আবেগঘন বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন, “আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।”

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে আয়োজিত বিদায়ী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ বিচার বিভাগ ও আইন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিদায়ী বক্তব্যে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে তিনি অবসরে যাচ্ছেন। তবে এটি কেবল বিচারিক দায়িত্বের সমাপ্তি নয়, বরং আইন পেশায় চার দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ কেবল বিচারক কিংবা আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অবসরের পরও দেশের বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিজের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া গেলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে অবসর নেওয়া যায় না।”
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সততা, এরপর চরিত্র এবং নিয়মিত অধ্যয়ন।

আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সংবিধান, প্রচলিত আইন, দেশি-বিদেশি বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারতত্ত্ব নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনভিত্তিক গবেষণা ও শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলার জট কমানো, বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও সেবামুখী করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। জনগণের কাছে ন্যায়বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই হবে না, সেটি দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য হওয়াও জরুরি। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা, আর সেই আস্থা অটুট রাখা বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর মতে, বিচক্ষণভাবে প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি, মামলার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জনগণের ভোগান্তি হ্রাস এবং ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা জয় করে নির্ভয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের বিচারকদের নিষ্ঠা, সততা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ আরও বৃদ্ধি পাবে।

বক্তব্যের শেষাংশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, “বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; বরং বিচারবোধ, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থায় নিহিত।” একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; বরং সংবিধান, আইন এবং নিজের বিবেকের প্রতিই হওয়া উচিত।