কুড়িগ্রাম | ১২ জুলাই ২০২৬ : কুড়িগ্রাম সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে কর্মস্থলে নিয়মিত অনুপস্থিতি এবং সরকারি কর্মঘণ্টায় বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র, হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী সপ্তাহের অধিকাংশ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাধারণত সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার কুড়িগ্রামে অবস্থান করেন এবং বাকি সময় ঢাকায় থাকেন। এছাড়া কুড়িগ্রামে অবস্থানকালেও সরকারি কর্মঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
রোগীদের অভিযোগ, জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনে আরএমওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে অধিকাংশ সময় তার কক্ষ বন্ধ পাওয়া যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে ফিরে যেতে হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্ন আয়ের রোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, আরএমওর অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে হাসপাতালের প্রশাসনিক তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, চিকিৎসাসেবা সমন্বয় এবং সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্টোরকিপার মমিনুল ইসলাম ও সদ্য বদলি হয়ে আসা প্রধান সহকারী ইউনুছ আলী গত এক সপ্তাহে উচ্চমান সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর মো. আব্দুল মান্নানসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ঘটনার বিষয়ে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় কর্মপরিবেশ আরও অবনতি হয়েছে।
এদিকে, চলতি বছরের ৯ মে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে যোগদান করা মেডিকেল অফিসার ডা. বায়েজিদ হাসানের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র একদিন কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট হয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কুড়িগ্রাম সচেতন নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি খন্দকার খায়রুল আনম বলেন, সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং সরকারি কর্মঘণ্টায় ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস করা গুরুতর অনিয়ম। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী। তিনি বলেন, “সপ্তাহের চারদিন অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ সঠিক নয়। আমি প্রতি শনিবার তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে লিখিত ছুটি গ্রহণ করি এবং রবিবার সকালে এসে দায়িত্ব পালন করি।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নুর নেওয়াজ বলেন, “আরএমও প্রতি শনিবার ছুটি নেন। তার একটি অটিস্টিক সন্তান রয়েছে। সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য তাকে প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় থাকতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে চিকিৎসকরা কুড়িগ্রামে থাকতে আরও অনাগ্রহী হতে পারেন। এতে জেলার স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যক্তিগত কারণ থাকলেও সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটলে তা তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, চিকিৎসাসেবার মান এবং রোগীদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চপর্যায়ের নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।