মাত্র আট বছর বয়স। এই বয়সে শিশুদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা কিংবা খেলনা। অথচ সেই বয়সেই গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে সৎ মা ও ছোট ভাইয়ের মুক্তির আবেদন জানাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হাজির হয়েছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শিশু জেরিন।
রবিবার (২৮ জুন) সকালে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ঘাঘরকান্দা গ্রামের ভ্যানচালক মুন্না মোল্লার মেয়ে জেরিন নীরবে বসে আছে। তার গলায় ঝোলানো প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— “আমার মা ও ৮ মাসের ভাইয়ের জেল থেকে মুক্তি চাই।”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শিশু নির্যাতনের অভিযোগে গত ২০ মে কোটালীপাড়া থানা পুলিশ জেরিনের সৎ মা আকলিমাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। তার সঙ্গে থাকা প্রায় সাত মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য ছেলেও মায়ের সঙ্গে কারাগারে রয়েছে। এরপর থেকেই পরিবারটি চরম সংকটের মধ্যে দিন পার করছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জেরিন বলে, “মা জেলে যাওয়ার পর থেকে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। ছোট ভাইটাও কিছু বোঝে না। মা তার ভুল বুঝতে পেরেছে। আমি চাই মা আর আমার ছোট ভাই বাসায় ফিরে আসুক। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই।”
জেরিনের বাবা মুন্না মোল্লা বলেন, “যা হওয়ার হয়েছে। সংসারটা ভেঙে গেছে। সাত মাসের ছেলে সন্তানটি জেলে বড় হচ্ছে, আর তিনটি মেয়ে মাকে ছাড়া কষ্টে আছে। আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে আদালত যদি জামিন দেন, তাহলে পরিবারটি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। আমি একজন সামান্য ভ্যানচালক। সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা শাহানাজ বেগম বলেন, “প্রতিদিন জেরিনকে মায়ের জন্য কাঁদতে দেখি। শিশুটির এই আকুতি আমাদেরও ব্যথিত করে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, তবে শিশুদের বিষয়টি মানবিকভাবে দেখা প্রয়োজন।”
কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল বলেন, “একটি শিশুর হৃদয়ে ক্ষমা, মমতা ও ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে, জেরিনের আবেদন সেটিই প্রমাণ করে। মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে দুগ্ধপোষ্য শিশু ও তিন কন্যাশিশুর ভবিষ্যতের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।”
এদিকে রবিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকারি কাজে জেলা সদরে অবস্থান করায় জেরিন তার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি।
একদিকে বিচারাধীন মামলা, অন্যদিকে একটি শিশুর মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি— এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে জেরিনের ছোট্ট প্ল্যাকার্ড যেন সমাজের কাছে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়— শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?