রংপুর | ২২ জুন ২০২৬: জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রংপুরেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে ঘোষিত এই বাজেটকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ দুটোই সমানভাবে সামনে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা, কর্মসংস্থানের সংকট, মৌসুমি দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে আসা রংপুর অঞ্চলের জন্য জাতীয় বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি উন্নয়ন, টিকে থাকা এবং বৈষম্য দূরীকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নির্দেশনা।
নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলের জন্য এসব উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রংপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষি উৎপাদন অঞ্চল হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কর হ্রাসের ফলে এসব পণ্যের মূল্য কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট খাতে ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকার বরাদ্দকে রংপুর অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা। তিস্তা অববাহিকার নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা চিলমারী, কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার হাজারো পরিবার প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, নদীশাসন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
রংপুরের ব্যবসায়ী মহলও বাজেটকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও আঞ্চলিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে বিশেষ প্রণোদনার অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, রংপুরে শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য পৃথক আঞ্চলিক বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “এই বাজেট মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টা। তবে রংপুরের মতো দীর্ঘদিনের অবহেলিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ আঞ্চলিক উন্নয়ন প্যাকেজ থাকলে তা আরও কার্যকর হতো। রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে কৃষি, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অভিযোজন খাতে রংপুর উল্লেখযোগ্য সুফল পেতে পারে। অন্যথায় কাগজে-কলমে বড় বরাদ্দ থাকলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তার সুফল পৌঁছানো কঠিন হবে।
সার্বিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট রংপুরের জন্য সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মিশ্র বার্তা বহন করছে। কৃষি খাতে সহায়তা, নিত্যপণ্যের কর হ্রাস এবং জলবায়ু খাতে বাড়তি বরাদ্দ আশার সঞ্চার করলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা, আঞ্চলিক শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুগুলো এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।