লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) | ১৯ জুন ২০২৬ : পবিত্র কাবা শরিফের কালো গিলাফে সোনালি ও রুপালি সুতোয় খচিত পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং মনোমুগ্ধকর আরবি ক্যালিগ্রাফি মুসলিম বিশ্বের কাছে শ্রদ্ধা, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক। আর সেই মহিমান্বিত শিল্পকর্মের অন্যতম কারিগর হলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সন্তান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্যালিগ্রাফার মুখতার আলম শিকদার।
১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের রশিদেরঘোনা কবির মোহাম্মদ শিকদার পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মুখতার আলম শিকদার। তার বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাঈল শিকদার সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি।
সৌদি আরবেই তার বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে তিনি মক্কার বিখ্যাত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যালিগ্রাফিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন।
পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ বা ‘কিসওয়া’র সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা শুরু হয় ১৪২২ হিজরি সালে। জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মাদ সালেম বাজনাইদের সুপারিশে তিনি বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষায় সফলতার মাধ্যমে ২০০২ সালে তিনি কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সে ফর হলি কাবা কিসওয়ায় ক্যালিগ্রাফার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন।
বর্তমান কিসওয়ার নকশা প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার শেখ আবদুল রহিম আমিন বুখারীর তৈরি ‘সুলুস’ লিপির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মুখতার আলম শিকদার আধুনিক প্রযুক্তি ও নান্দনিক শিল্পশৈলীর সমন্বয়ে ক্যালিগ্রাফিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার নিখুঁত হাতের লেখায় কোরআনের আয়াত ও ইসলামী অলংকরণ আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালের নভেম্বরে সৌদি আরব সরকার তাকে দেশটির নাগরিকত্ব প্রদান করে। যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে নির্বাচিত পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তির একজন ছিলেন তিনি। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওই তালিকায় একমাত্র ক্যালিগ্রাফার ছিলেন মুখতার আলম শিকদার।
লোহাগাড়ার রশিদেরঘোনা গ্রামের এই কৃতী সন্তান আজ পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ অলংকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করছেন। তার এই অনন্য অর্জন শুধু চট্টগ্রাম বা লোহাগাড়ার জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন অধ্যবসায়, সৃজনশীলতা ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।