যশোর | ১৫ জুন ২০২৬ : যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষানীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে বিদ্যালয়টিকে কার্যত পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আমানত আলী। একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক ও অন্যান্য পদে কর্মরত রয়েছেন তার স্ত্রী, ভাই, বোনজামাই, বোনের নাতিসহ একাধিক নিকট আত্মীয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই পরিবারের এত সংখ্যক সদস্যের নিয়োগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে সম্প্রতি বিদ্যালয়ের তিনটি পদে নিয়োগ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী বছরের তারিখ ব্যবহার করে গোপনে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়োগে বিদ্যালয়ের নিয়মিত রেজুলেশন ছাড়াই তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত নথি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া নিয়োগপ্রাপ্তদের এমপিওভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অধিকাংশ নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষক পরিষদ বা সংশ্লিষ্টদের আগে থেকে অবহিত করা হয় না। নিয়োগ প্রক্রিয়া গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন করা হয় এবং পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
রোববার (১৪ জুন) সকালে কথিত নতুন তিনটি নিয়োগের তথ্য স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও এলাকাবাসীর কয়েকজন বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চান। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে স্থানীয়রা তাকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে তিনি বিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এক শিক্ষিকা নিজেকে প্রধান শিক্ষক আমানত আলীর প্রথম স্ত্রী দাবি করে অভিযোগ করেন, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পরও তিনি পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেননি এবং বর্তমানে দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা বসবাস করছেন।
আরেক শিক্ষিকা বলেন, সরকারি নিয়োগে আসা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা ও নৈতিকতা গঠনের কেন্দ্র হওয়া উচিত। সেখানে যদি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
এ বিষয়ে জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন স্থানীয় শিক্ষাঙ্গন ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।