ঢাকা | ১১ জুন ২০২৬ : জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের পর দেশের অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজেটকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমিত আয়ের সঙ্গে খরচের ভারসাম্যহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ।

মূল্যস্ফীতির চাপেই সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তাঃ
গত এক বছরে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, মাছ ও সবজিসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

রাজধানীর একটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন,
“বেতন বাড়ে না, কিন্তু প্রতিবার বাজেটের পর বাজারের খরচ বাড়ে। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে চাল-ডালের দাম কমানো। উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে সংসারের বাজারের স্বস্তি এখন বেশি প্রয়োজন।”

গৃহিণী ফাতেমা বেগম জানান, “আগে এক হাজার টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত। এখন দুই দিনের বাজার করতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। নতুন বাজেটের পর যদি দাম আরও বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হবে।”

মোবাইল ও ইন্টারনেট খরচ বাড়ার আশঙ্কাঃ নতুন বাজেটে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কিছু কর পুনর্বিন্যাসের কারণে মোবাইল কলরেট এবং ইন্টারনেট সেবার খরচ বাড়তে পারে বলে বাজারে আলোচনা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ বলেন,
“বর্তমানে শিক্ষা, গবেষণা ও অনলাইন ক্লাসের জন্য ইন্টারনেট অপরিহার্য। ডেটা খরচ বাড়লে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে।”

ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল উদ্যোক্তারাও ইন্টারনেট ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি বিকাশে ইন্টারনেটকে আরও সাশ্রয়ী করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগঃ ব্যবসায়ী মহলের একাংশ মনে করছে, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনা আগেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাদের মতে, নতুন করনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণঃ অর্থনীতিবিদ ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, “সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক দিক। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।” তিনি আরও বলেন, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

 

বাজার তদারকি জোরদারের দাবিঃ সচেতন নাগরিক, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সাধারণ ক্রেতাদের প্রধান দাবি হচ্ছে— বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। তাদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে বাজেটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে, সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাঃ অর্থনীতির বড় সূচক, প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজস্ব আয়ের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিত্যপণ্যের দাম, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয়।

নতুন বাজেট কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাজারে মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে তার ওপর।