রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার উজালখলসী গ্রামের রাইচাঁদ নদীর তীরে বসেছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ঘোড়াদহ মেলা। এক সময় এই মেলাই ছিল গ্রামীণ জীবনের প্রাণের উৎসব— নদীতে নৌকা বাইচ, তীরে ঘোড়দৌড় আর চারপাশে উৎসবের আমেজে ভরপুর থাকত এলাকা। তবে কালের বিবর্তনে সেই জৌলুস আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) ঘুরে দেখা যায়, একসময় প্রাণবন্ত রাইচাঁদ নদী এখন নাব্যতা হারিয়ে কচুরিপানায় ভরে গেছে। নদীর প্রবাহ রোধে বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছে সুইসগেট। ফলে বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নৌকা বাইচ ও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা।

তবুও ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয়রা প্রতিবছরই আয়োজন করে যাচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ঘোড়াদহ মেলার ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। তাঁদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই মেলাটি চলে আসছে। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শেষ দিন থেকে শুরু হয়ে কার্তিকের ২ তারিখ পর্যন্ত চলে এই আয়োজন।

মেলাটি মূলত উজালখলসী গ্রামে হলেও উৎসবের রেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো দুর্গাপুর উপজেলায়। আশপাশের আলীপুর, দেবীপুর ও শ্যামপুর গ্রামেও বসে ছোট ছোট উপমেলা।

বর্তমানে মেলায় হাজারো মানুষের ভিড় জমে। রাজশাহী, নওগাঁ, ফরিদপুর, বগুড়া, যশোর, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়া থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন নানা পণ্য নিয়ে। ফার্নিচার, শীতের পোশাক, মৃৎশিল্প, খেলনা ও গ্রামীণ পণ্য নিয়ে বসে শত শত দোকান।

শিশুদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, সার্কাস ও ডিজিটাল রাইড— যা এখন মেলার প্রধান আকর্ষণ। মেলাকে ঘিরে চারপাশের গ্রামগুলোয় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। জামাই-মেয়েকে দাওয়াত দিয়ে পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম এখন এই অঞ্চলের এক বিশেষ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ রমজান আলী বলেন, “আমাদের ছোটবেলা থেকেই এই মেলা দেখে আসছি। তখন নদীতে নৌকা বাইচ, তীরে ঘোড়দৌড় হতো। এখন আর সেই উৎসবের দিন নেই।”

মৃৎশিল্পী স্বপন কুমার দাশ বলেন, “আগে মেলা ১০ দিন পর্যন্ত চলত, এখন ২-৩ দিনেই শেষ হয়। তবুও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর আসি।”

মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি শাহ আলম চৌধুরী বলেন, “২০১৮ সাল পর্যন্ত খুব জমজমাটভাবে মেলা অনুষ্ঠিত হতো। এখন সময় কমে গেলেও স্থানীয়দের আগ্রহে আমরা এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।”

নদীর নাব্যতা হ্রাস, আধুনিক বিনোদনের বিকল্প ও নতুন মেলার আগ্রাসনে ঘোড়াদহ মেলা তার পুরোনো চেহারা হারালেও, শত বছরের স্মৃতি বয়ে চলা এই আয়োজন এখনো গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে স্থানীয়দের মনে ও ভালোবাসায়।