জাহাঙ্গীর আলম মানিক|সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন ও মরুকরণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। তবে দীর্ঘদিন ধরে জনবল নিয়োগ বন্ধ থাকায় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি তীব্র জনবল সংকটে পড়েছে। ফলে সেচ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার লালডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মো. মোক্তার হোসেন বলেন, ১৯৮৫ সালের আগে বরেন্দ্র অঞ্চল ছিল উঁচু-নিচু টিলা, লাল কংকরময় মাটি ও পানিশূন্য এক রুক্ষ প্রান্তর। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে কৃষক ও তার হালের বলদকে দেখা যেত চরম কষ্টে। মাঠজুড়ে ছিল বিরানভূমি, আর দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত তালগাছ, বাবলা ও ক্যাকটাসের ঝোপঝাড়।
গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আতাউল ইসলাম জানান, একসময় এ অঞ্চলে বছরে মাত্র একটি ফসল হতো, সেটিও সম্পূর্ণ বৃষ্টিনির্ভর। একরে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে বিএমডিএ স্থাপিত গভীর নলকূপের পানির কারণে একরে ৮০ থেকে ৯০ মণ ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। অনেক জমিতে বছরে তিনটির বেশি ফসল হচ্ছে। তিনি বলেন, “গভীর নলকূপ চললে ভাত মেলে—এটাই এখন আমাদের বাস্তবতা।”
বিএমডিএ’র সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন (আরআইআইপি) প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মুহাম্মদ মতিউর রহমান বলেন, বিএমডিএ পরিচালিত অনেক গভীর নলকূপের বয়স ৩৫ থেকে ৪০ বছর। অথচ একটি গভীর নলকূপ সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর কার্যকর থাকে। পুরোনো নলকূপগুলোর ফিল্টার, পাইপ, হাউজিং ও মোটর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানির সঙ্গে বালি ও পাথর উঠছে এবং যেকোনো সময় এগুলো অচল হয়ে যেতে পারে। তাই জরুরি ভিত্তিতে এসব নলকূপ পুনঃখনন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, অচল হয়ে পড়া গভীর নলকূপ পুনঃখননের মাধ্যমে পুনরায় সেচ কার্যক্রম চালু রাখতে আরআইআইপি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিএমডিএ’র নিজস্ব অর্থায়নে এসব প্রকল্প পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের নতুন প্রকল্প অনুমোদন জরুরি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রাচীনকালে বরেন্দ্র অঞ্চল ছিল বনজ ও কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা। ইতিহাসবিদ নেলসনের (১৯২৩) মতে, এ অঞ্চল একসময় ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। উইলিয়াম হান্টারের (১৮৭৬) বর্ণনায়ও উল্লেখ আছে যে, বাংলার প্রায় সব ধরনের গাছপালা বরেন্দ্র অঞ্চলে পাওয়া যেত।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমির সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপন এবং কাঠের ব্যাপক ব্যবহারসহ নানা কারণে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয় এ অঞ্চলের বনভূমি। ফলে শুরু হয় মরুকরণ প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে কমতে থাকে বৃষ্টিপাত। যেখানে দেশের গড় বৃষ্টিপাত ২৫০০ মিলিমিটার, সেখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে তা প্রায় ১৪০০ মিলিমিটার।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন বিএডিসি’র প্রকৌশলীরা বিশেষ ধরনের গভীর নলকূপ উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচের সুযোগ সৃষ্টি করেন। এরপর ১৯৯২ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫টি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠা করা হয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
বর্তমানে বিএমডিএ ১৬ জেলায় ১৫ হাজার ৭৯৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। এছাড়া ১৩ হাজার ৫০১ কিলোমিটার সেচ বিতরণ লাইন, ৫৩২টি এলএলপি, ১১৯টি সৌরচালিত এলএলপি, ২০২৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, ৭৪৯টি ক্রসড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। পাশাপাশি ২ কোটি ৫৮ লাখ গাছ রোপণ, বছরে ৬০০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন এবং প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে বর্তমানে বিএমডিএতে মাত্র ৭২৬ জন জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৮ সালের পর থেকে নতুন কোনো জনবল নিয়োগ হয়নি।
অথচ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজন আরও ১ হাজার ৯১১ জন জনবল।
বিএমডিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবুল কাসেম বলেন, “প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে বিএমডিএতে দ্রুত নতুন জনবল নিয়োগ এবং প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।