ঠাকুরগাঁও, ১৬ আগস্ট ২০২৬: ঠাকুরগাঁওয়ে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও বন্ধ হয়নি মাদকের সরবরাহ। চলতি বছরের মার্চ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) বিভিন্ন মামলায় ৫১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, টাপেন্টাডল, ফেনসিডিল, গাঁজা ও দেশি মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬ হাজার ৪৯১ পিস ইয়াবা, ৪ হাজার ৬৬ পিস টাপেন্টাডল, ৩২ বোতল ফেনসিডিল, ৭ কেজি ৩৮ গ্রাম গাঁজা, ৪৪২ লিটার দেশি মদ, ১০৫ বোতল ফেন্সিবিল, ২ বোতল ইস্কফ সিরাপ ও ৩ বোতল এমকেড্রিল জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মাদক সেবনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮৪টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং ৮৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জুনে সর্বোচ্চ ইয়াবা উদ্ধার
পুলিশের মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন মাসে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই মাসে ২ হাজার ১৫৯ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। মার্চে উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ৫৩৭ পিস ইয়াবার তুলনায় জুনে ৬২২ পিস বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে।
মার্চে ডিবির অভিযানে ১ হাজার ৫৩৭ পিস ইয়াবার পাশাপাশি ৭৮৩ পিস টাপেন্টাডল, ৩২ বোতল ফেনসিডিল, ৬২৫ গ্রাম গাঁজা, ১৬১ লিটার দেশি মদ ও ৭৮ বোতল ফেন্সিবিল জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ৬৭টি মামলায় ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এপ্রিলে ৪২৪ পিস ইয়াবা, ১৬১ পিস টাপেন্টাডল, ৫৩৩ গ্রাম গাঁজা ও ২ বোতল ইস্কফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। ওই মাসে ৩২টি মামলায় ৪৬ জন গ্রেপ্তার হন।
মে মাসে ৭১৬ পিস ইয়াবা, ৫৩১ পিস টাপেন্টাডল, ৭৮৬ গ্রাম গাঁজা এবং ২৩৫ লিটার দেশি মদ জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ৬০টি মামলায় ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জুনে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৫৯ পিসে। এ ছাড়া ৩৫০ পিস টাপেন্টাডল ও ২ কেজি ৮৫২ গ্রাম গাঁজা জব্দ করা হয়। ওই মাসে ৬৬টি মামলায় ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জুলাই মাসে টাপেন্টাডল উদ্ধারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই মাসে ১ হাজার ৩১১ পিস ইয়াবার পাশাপাশি ১ হাজার ৭৫৫ পিস টাপেন্টাডল, ২৭ বোতল ফেনসিডিল, ২ কেজি ১৫২ গ্রাম গাঁজা, ২৫ লিটার দেশি মদ এবং ৩ বোতল এমকেড্রিল জব্দ করা হয়।
এসব ঘটনায় ৬৮টি মামলায় ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্টের প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে জুলাই মাসেই সবচেয়ে বেশি ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আগস্টের প্রথম ১৪ দিনেও মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত ছিল। এ সময়ে ৩৪৪ পিস ইয়াবা, ৪৮৬ পিস টাপেন্টাডল, ৯০ গ্রাম গাঁজা ও ২১ লিটার দেশি মদ জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় ২১টি মামলায় ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাঁচ শতাধিক গ্রেপ্তারের পরও প্রশ্ন সরবরাহ নিয়ে
মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং শত শত মানুষ গ্রেপ্তার হলেও ঠাকুরগাঁওয়ে মাদকের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—মাদকের উৎস কোথায়, কীভাবে এসব মাদক জেলায় প্রবেশ করছে এবং কারা এর পেছনে সক্রিয়?
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ইয়াবা ও টাপেন্টাডলের মতো মাদক নিয়মিত উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও তাঁদের মতে, শুধু বহনকারী বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তাঁদের দাবি, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী এবং এর পেছনে থাকা মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কলেজ শিক্ষক মো. আতাউর রহমান বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
ঠাকুরগাঁও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রসুল কাজল বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ডিবির অভিযান নিয়মিত চলছে। শুধু মাদক উদ্ধার ও বহনকারীদের গ্রেপ্তার নয়, এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোথা থেকে মাদক আসছে, কীভাবে তা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে ‘কঠোর অবস্থান’ পুলিশের
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। মাদকদ্রব্য উদ্ধার, মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকের মূল উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
তিনি বলেন, গত সাড়ে সাত মাসে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ এবং পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় মাদকের উৎস, সরবরাহ চেইন এবং মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টিই এখন ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া