কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা খাতুন ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবেদনপত্রে পেশা হিসেবে ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কীভাবে তথ্য সংগ্রহকারী পদে নিয়োগ পেলেন এ নিয়ে জানতে চাইছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন ইউপি সদস্য নিজ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলে তার জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের সঙ্গে তথ্য সংগ্রহকারীর দায়িত্বের কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার বলে মনে করছেন তারা।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত রেহানা খাতুন পাইকেরছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য।
সমাজসেবা অফিসে যাওয়ার সময় তিনি ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের বিষয়ে জানতে পারেন। পরে একটি কম্পিউটার দোকান থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে আবেদন করেন। ওই আবেদনে তিনি পেশা হিসেবে ‘গৃহিণী’ উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে পরীক্ষার জন্য তার মোবাইলে বার্তা আসে। তিনি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং পরীক্ষায় করা চারটি প্রশ্নের উত্তর সঠিক দিয়েছেন বলে জানান।
ফল প্রকাশের পর তিনি তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিজের নাম দেখতে পান।
নিজের নিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়ে রেহানা খাতুন বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে সরকারের একটি কাজে সহযোগিতা করার জন্য তিনি আবেদন করেছেন। তবে আইন বা নীতিমালায় জনপ্রতিনিধির এ ধরনের দায়িত্ব পালনে বাধা থাকলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলে তার কোনো আপত্তি নেই।
রেহানা খাতুন আরও জানান, ইউপি সদস্য হিসেবে তিনি মাসিক ৩ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানী পান। তার স্বামী আবু সাঈদ অসুস্থ এবং তার চিকিৎসার ব্যয়ও বহন করতে হয়।
নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ শামছুজ্জামান বলেন, আবেদনপত্রে প্রার্থী ইউপি সদস্য হিসেবে তার পরিচয় উল্লেখ করলে বিষয়টি বিবেচনা করা সহজ হতো।
তবে রেহানা খাতুনের নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার আগে নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের আওতায় যারা কাজ করতে পারবেন না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি নীতিমালায় নির্ধারিত সেই শ্রেণির মধ্যে পড়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় পরিচয় বা সুপারিশের ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের অভিযোগের বিষয়টি জানতে চাইলে ইউএনও অভিযোগটি নাকচ করে বলেন, সঠিকভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্যান্য উপজেলার ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফলে মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হলেও ভূরুঙ্গামারীতে প্রকাশিত ফলাফলে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ বলেন, একেক উপজেলা একেক ফরম্যাটে ফলাফল প্রকাশ করেছে। ভূরুঙ্গামারীতেও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কারণ মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সম্ভাব্য উপকারভোগী পরিবার শনাক্ত ও পরবর্তী যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ কারণে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি একই এলাকার পরিবারের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পান, তাহলে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এবং স্বার্থের সংঘাত কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
তবে শুধু ইউপি সদস্য হওয়াই যে তথ্য সংগ্রহকারী পদে অযোগ্যতার প্রমাণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্রের শর্ত এবং ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের প্রযোজ্য গাইডলাইন পর্যালোচনা করেই বিষয়টির বৈধতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রেহানা খাতুনের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বিধিমালা বা যোগ্যতার শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হোক।
একই সঙ্গে আবেদনপত্রে ‘গৃহিণী’ পেশা উল্লেখের বিষয়টি কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, আবেদন যাচাইয়ের সময় তার ইউপি সদস্য পরিচয় কর্তৃপক্ষের জানা ছিল কি না এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার বর্তমান দায়িত্ব তথ্য সংগ্রহকারী পদে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নেরও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এখন সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও নিয়োগের শর্ত পর্যালোচনার পর উপজেলা প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া