ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, অতি জোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি থেকে উপকূলের জনপদকে সুরক্ষিত রাখতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতায় উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নদীতীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের বিভিন্ন অংশের ক্ষয়, মাটি ধস, ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জিওব্যাগ সরে যাওয়ার অভিযোগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মনপুরার এই প্রকল্প নিয়ে এর আগেও নির্মাণমান, ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনা ও কাজের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি বাঁধের কিছু অংশ ধসে পড়ার কথাও উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে পাউবোর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি আলোচিত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক অতি জোয়ার ও টানা ভারী বর্ষণের পর বাঁধের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও মাটি সরে গিয়ে ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু এলাকায় জিওব্যাগও স্থানচ্যুত হয়েছে বলে দাবি তাদের। তবে এসব ক্ষতির প্রকৃত কারণ নির্মাণগত ত্রুটি, প্রাকৃতিক চাপ নাকি রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি—তা নির্ধারণে কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন।
মনপুরার বাসিন্দারা বলছেন, যে বাঁধ তাদের নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেটিই যদি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নদীঘেরা এই দ্বীপ উপজেলায় জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদীভাঙন উপকূলবাসীর জন্য নিয়মিত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও মনপুরায় অতি জোয়ারের কারণে মেঘনার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে মেঘনার পানি বিপৎসীমার প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কথা জানানো হয়। এতে বেড়িবাঁধের ভেতর-বাইরের নিম্নাঞ্চল পাঁচ থেকে ছয় ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় এবং হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
এর আগে ৮ জুলাইও টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে মনপুরায় মেঘনার পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখনও বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়।
শুধু জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস নয়, পানি নিষ্কাশন নিয়েও মনপুরায় দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। জুলাই মাসে টানা ভারী বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। পাউবো ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও পানি নিষ্কাশন সমস্যা সমাধানে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও কাজ নিয়ে বিভ্রান্তি
মনপুরার বাঁধ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫২ কিলোমিটার বাঁধ, ১৭১টি সাবমার্সিবল স্পার, ৩৭ কিলোমিটার এলাকায় জিওব্যাগ ও টিউব ডাম্পিং এবং ১০টি স্লুইসগেট নির্মাণের কথা বলা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ‘ভোলা জেলার চরফ্যাশন ও মনপুরায় উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে মনপুরায় পুরোনো বাঁধ সংস্কার করে প্রায় ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগের কথা বলা হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব প্রকল্প-রিপোর্ট তালিকাতেও ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরায় উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের কারিগরি প্রতিবেদন সংক্রান্ত নথি রয়েছে।
এ কারণে প্রকল্পের বর্তমান অনুমোদিত ব্যয়, সংশোধিত ডিপিপি, কাজের অগ্রগতি এবং অবশিষ্ট কাজের পরিমাণ সম্পর্কে পাউবোর কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগেও উঠেছিল নির্মাণমান নিয়ে অভিযোগ
মনপুরার বাঁধ নির্মাণকে ঘিরে এর আগেও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অনিয়ম ও কাজের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থানীয়দের অভিযোগ হিসেবে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, বাঁধের উচ্চতা ও পরিধি নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে পাউবো কর্মকর্তারা অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এছাড়া ২০২৫ সালে মনপুরায় বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুনে বাসসের প্রতিবেদনে বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে উপকূলের সবুজ বেষ্টনী ও গাছ কাটার বিষয়েও স্থানীয়দের উদ্বেগের কথা উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের কিছু এলাকায় গাছ কাটার বিষয়ে আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ থাকার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল।
প্রকল্প পরিদর্শনে কাজের মান বজায় রাখার নির্দেশ
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পানি সম্পদ সচিব ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়নকাজ পরিদর্শন করেন। ওই সময় মনপুরার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের মান সিডিউল অনুযায়ী বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে এখন বাঁধের বিভিন্ন অংশে ক্ষয় ও ঝুঁকির অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের দাবি—শুধু নিয়মিত পরিদর্শন নয়, প্রকল্পের প্রতিটি কাজের গুণগত মান পুনরায় যাচাই করতে হবে।
জবাবদিহির দাবি মনপুরাবাসীর
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় সুরক্ষা প্রকল্প যদি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে এর দায় কার?
তাদের দাবি, বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা, নির্মাণসামগ্রী, মাটি ভরাট, জিওব্যাগ স্থাপন, ঢালের স্থায়িত্ব, স্লুইসগেট ও নদীতীর সংরক্ষণকাজসহ প্রতিটি অংশের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কোনো নির্মাণগত ত্রুটি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, তদারকির ঘাটতি কিংবা চুক্তির শর্ত ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
মনপুরাবাসীর প্রত্যাশা—বেড়িবাঁধটি শুধু কাগজে-কলমে একটি বড় প্রকল্প হয়ে থাকবে না; বরং প্রকৃত অর্থে উপকূলের মানুষের জীবন, বসতভিটা, কৃষিজমি ও সম্পদ রক্ষার স্থায়ী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এ অবস্থায় বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ও ব্যয়ের স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং নির্মাণমানের নিরপেক্ষ কারিগরি পরীক্ষা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
তবে বাঁধের বর্তমান ক্ষয় বা ধসের নির্দিষ্ট কারণ এবং এর জন্য কারও দায় রয়েছে কি না—তা কারিগরি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অভিযোগগুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করাই হবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া