কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশ দিয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের ৮ ইঞ্চি ব্যাসের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন কেটে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। পাইপলাইন কেটে ফেলার পর গত প্রায় দেড় মাস ধরে নদীর পানি থেকে অবিরাম গ্যাস উদগিরণ হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় অগ্নিকাণ্ড বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
কটিয়াদী উপজেলার কাজীরচর বাজারসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদ এলাকায় বর্তমানে পাইপলাইন মেরামতের কাজ চলছে। তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী সুমেধ মনি চাকমার তত্ত্বাবধানে একটি কারিগরি দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। তিতাস গ্যাসের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকাতেও সুমেধ মনি চাকমাকে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক অপারেশন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত দেখানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতে পানি বেশি থাকায় এবং পাইপলাইনের চারপাশের বালু ধসে পড়ায় মেরামতকাজে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চেষ্টা চালিয়েও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পানি সেচে কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও একদিকে পানি সরানোর পর অন্যদিকে বালুর ভেতর দিয়ে আবার পানি ঢুকে পড়ছে।
তিতাস গ্যাসের সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ বছর আগে নরসিংদীর মনোহরদী থেকে কিশোরগঞ্জ শহর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশ দিয়ে এই প্রধান গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস সরবরাহ হয়ে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দেলোয়ার হোসেন তালুকদার নামে এক ব্যক্তি কাজীরচর এলাকায় চুন তৈরির কারখানা স্থাপনের কথা বলে ১৭ শতক জমি তিন বছরের জন্য ভাড়া নেন। এরপর প্রভাবশালী একটি চক্রের সহযোগিতায় গভীর রাতে বিশেষজ্ঞ কারিগর এনে নদীর তলদেশে থাকা গ্যাস পাইপলাইন কাটার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, পাইপলাইন কেটে গ্যাস চুরি অথবা ড্রামে গ্যাস ভরে অন্যত্র পাচারের উদ্দেশ্যেই এমন কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকতে পারে। তবে অভিযোগের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় ঘটনাস্থল প্লাবিত হয়। এতে কথিত অবৈধ সংযোগের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই সংশ্লিষ্টরা সরে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পাইপলাইনের কেটে ফেলা অংশ দিয়ে উচ্চচাপে গ্যাস বের হতে থাকায় নদীর পানি ছিটকে ওপরে উঠছে। পাশাপাশি আশপাশের বাতাসে তীব্র গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে নদীর আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ অঞ্চলের ডিজিএম প্রকৌশলী সুমেধ মনি চাকমা জানান, নদীর পানির গভীরতা এবং তলদেশের বালু মেরামতকাজের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি সেচে ফেলার পরও বালুর ভেতর দিয়ে আবার পানি ঢুকে পড়ছে। তবে দ্রুত মেরামতকাজ শেষ করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও জানান, মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পর তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মামলা করা হবে।
এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, তিনি এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) নাহিদ হাসান খান ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসের মতো স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর পাইপলাইন কাটার মতো ঘটনা ঘটলেও স্থানীয়রা সময়মতো প্রশাসনকে অবহিত না করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পাইপলাইন মেরামতের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া গ্যাস সঞ্চালন লাইনের নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের নাশকতা বা অবৈধ সংযোগের চেষ্টা ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া