জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন সাংগঠনিক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। দলের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এই কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র অনুমোদন এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রথম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। কাউন্সিলকে সামনে রেখে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস এবং সাংগঠনিক কাঠামো আধুনিকায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পাওয়ার পাশাপাশি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জোটগতভাবে ছয়টি সাধারণ ও দুটি সংরক্ষিত নারী আসন অর্জন করে এনসিপি। বর্তমানে দলটির সংসদে আটজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
বর্তমানে এনসিপির কেন্দ্রীয় কাঠামোতে আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সমন্বয়ক, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, দুইজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব এবং একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কসহ মোট ১১টি গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দল হিসেবে সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কের মতো পদ বাদ দিয়ে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের আদলে আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবকেন্দ্রিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পদসংখ্যা কমানো নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক করাই এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য।
এনসিপির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা কোনো একক নেতার হাতে নয়। ১৮ সদস্যের রাজনৈতিক পর্ষদ (পলিটিক্যাল কাউন্সিল) সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক পর্ষদের ক্ষমতা ও ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকবে।
বর্তমানে এনসিপি একটি খসড়া গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম জাতীয় কাউন্সিলে সেই খসড়া প্রতিনিধি ও কাউন্সিলরদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। আলোচনা শেষে অনুমোদিত গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে দলটি পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রবেশ করবে।
নতুন গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন, কাউন্সিলের মেয়াদ, জেলা ও উপজেলা কমিটি, সদস্যপদ, শৃঙ্খলা বিধি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক পর্ষদের ক্ষমতা, সংসদীয় দলের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, নতুন কাঠামোতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো আহ্বায়ক, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ও যুগ্ম সদস্য সচিবের কাঠামো অনুসরণ করা হবে। বর্তমান মুখ্য সংগঠক পদটি নতুন কাঠামোয় থাকবে না।
তবে দলটির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আত্মপ্রকাশের পরও এনসিপি এখনও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করতে পারেনি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের যোগদানের ফলে সাংগঠনিক পরিসর দ্রুত বাড়লেও কাঠামোগত দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া গাজীপুর মহানগর শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব আতাউল্লাহ শাহকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ভবিষ্যতে নেতৃত্ব নির্বাচনে আরও সতর্ক হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন দলটির নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল এনসিপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দলটি ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া