গোপালগঞ্জ শহরের পরিচিত মুখ জামিল শেখ। জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী হলেও জীবনের প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে টানা প্রায় ৩০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করে চলেছেন তিনি। কথা বলতে না পারলেও পরিশ্রম, সততা ও আত্মমর্যাদার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন গোপালগঞ্জবাসীর কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা জামিল শেখের বয়স প্রায় ৪০ বছর। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মাত্র ১০ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে সংবাদপত্র বিক্রির কাজ শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিদিন ভোরে কাঁধে পত্রিকার ব্যাগ নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংবাদপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন পাঠকদের হাতে।
পুলিশ লাইনস, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকান ও বাসাবাড়িতে প্রতিদিন নিয়মিত পত্রিকা সরবরাহ করেন জামিল। রোদ, বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড গরম—কোনো প্রতিকূল আবহাওয়াই তার কর্মস্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাকশক্তি না থাকলেও মানুষের ইশারা ও চাহিদা সহজেই বুঝে নেন তিনি। ক্রেতারা যে পত্রিকার নাম চান, মুহূর্তেই সেটি বের করে দেন। হিসাব-নিকাশেও তার নির্ভুলতার সুনাম রয়েছে।
তবে ডিজিটাল যুগে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ছাপা পত্রিকার চাহিদা কমেছে। ফলে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে জামিলের আয়। তবুও তিনি কখনো ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেননি। নিজের শ্রম ও আত্মসম্মানকে পুঁজি করেই জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় সংবাদপত্র বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক খালিদ হোসেন জানান, জামিল তিন দশক ধরে নিয়মিত তার প্রতিষ্ঠান থেকে পত্রিকা নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন। সততা, দায়িত্ববোধ ও পরিশ্রমের জন্য তিনি সবার কাছে সমানভাবে প্রশংসিত। দীর্ঘ কর্মজীবনে হিসাব-নিকাশে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসততার অভিযোগ ওঠেনি।
স্থানীয়দের কাছেও জামিল একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সংগ্রামী মানুষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তার উপার্জনের ওপরই নির্ভর করছে পরিবারের ব্যয় এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা।
গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. জুবায়ের হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই জামিল নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। বর্তমানে পত্রিকার বিক্রি কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে। এমন একজন পরিশ্রমী মানুষের পাশে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পরিবারের দাবি, এক সময় জামিল সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সংসারের দায়িত্ব বহন করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জামিলের মা শিরিয়া বেগম বলেন, আগে তার ছেলে প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন। কী কারণে সেই সুবিধা বন্ধ হয়েছে তা তারা জানেন না। বর্তমানে জামিলের পত্রিকা বিক্রির আয়ই পরিবারের একমাত্র ভরসা।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি এবং ভাতা কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি। তিনি বলেন, জামিল বা তার পরিবারের সদস্যরা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে রেকর্ড যাচাই করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যোগ্যতা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে নিজের শ্রম, সততা ও আত্মসম্মানকে পুঁজি করে এগিয়ে চলা জামিল শেখ আজ শুধু একজন পত্রিকা বিক্রেতা নন; তিনি অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা ও মানবিক মর্যাদার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
ওয়েবসাইটঃ www.saradesh71.com, নিউজ রুমঃ news@saradesh71.com
কপিরাইট স্বত্ব © সারাদেশ একাওর নিউজ পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া